শনিবার ১৯ আগস্ট, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

সোলার শেয়ারিংঃ বিদ্যুৎ কৃষির যৌথ খামার

মাহবুব সুমন
প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার, ০৯:২৭  পিএম

সোলার শেয়ারিংঃ বিদ্যুৎ কৃষির যৌথ খামার

আমাদের মত দেশে সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যলেঞ্জ জায়গার ব্যবস্থা করা। কারন আমাদের জনসংখ্যা পরিমানে এবং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী। এই বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দরকার। পর্যাপ্ত জায়গা আছে। তবুও অনেকেই দেশের স্বচ্ছ ধারনার অভাবে পর্যাপ্ত জায়গা আছে এই কথার সাথে একমত হতে পারেননা। তাদের প্রধান চিন্তা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে যদি আমাদের কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়! অত্যন্ত যৌক্তিক দুশ্চিন্তাা। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে খাদ্য উৎপাদনের সমস্যা হলে সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এক্ষেত্রে আমাদের কৃষিকে বিন্দু মাত্র ক্ষতিগ্রস্ত না করে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় সেটিই হবে উত্তম। নিচে কিছু বাস্তব উদাহরন সহ দেখানো হবে যে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত না করেই সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করা সম্ভব।
আকিরা নাগাশিমা নামের একজন জাপানি কৃষিবিদ সোলার শেয়ারিং নামের একটি নতুন ধারনা নিয়ে আসেন ২০০৪ সালে। তিনি দেখতে পান উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ আলো বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর আলো বাড়লেও সালোক সংশ্লেষণের মাত্রা আর বাড়েনা। সালোক সংশ্লেষণের ক্ষেত্রে আলোর এই মাত্রাকে বলা হয় লাইট স্যাচুরেশন পয়েন্ট। নাগাশিমা দেখতে পেলেন যে সূর্যের আলো অনেক বেশী পরিমানে আসতে থাকলেও একটা পর্যায়ের পর তা উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে বাড়তি কোন ভুমিকা রাখছেনা। উদ্ভিদ তার যতটুকু দরকার ততটুকু সূর্যের আলো পেলেই সুস্থ সবল ভাবে বাড়তে পারছে। নাগাশিমা তখন একই জমিতে কৃষি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারনা নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে একটি কার্যকর ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন। এটিই পরবর্তীতে সোলার শেয়ারিং নামে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ২০০৪ সালে আকিরা নাগাশিমা যখন এই ধারনা নিয়ে আসেন তখনকার চেয়ে এখন বাজারে দ্বিগুণ ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল পাওয়া যায়। ফলে আকিরা নাগাশিমা এক একর জমিতে যতটুকু বিদ্যুৎ এবং খাদ্য উৎপাদন করে দেখিয়েছিলেন এখন খাদ্য উৎপাদন একই পরিমানে হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তার দ্বিগুণ। নির্দিষ্ট পরিমান জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপদনের পরিমান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে বেড়েই চলছে। সোলার শেয়ারিং পদ্ধতিতে প্রতি ৫..২ (পাঁচ দশমিক দুই) একর (পলি ক্রিস্টালাইন প্যানেল দিয়ে) জায়গায় সমান্তরালভাবে কৃষি এবং এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। মনো ক্রিস্টালাইন প্যানেল দিয়ে এক্ষেত্রে জায়গা লাগবে আরো কম।

সোলার শেয়ারিং ফিল্ড টেস্ট, আকিরা নাগাশিমা, শিবা প্রিফেকচার
নাগাশিমার সোলার শেয়ারিং ধারনার উপর ভিত্তি করে জাপানের মিনিস্ট্রি অফ এগ্রিকালচার, ফরেস্ট্রি এন্ড ফিশারিজ (গঅঋঅ) কৃষি জমির উপর সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু গাইড লাইন তৈরী করে দেয়। কারন এর আগে খাদ্য উৎপাদন বিঘিœত হবে বলে জাপানে কৃষি জমির উপর সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিষিদ্ধ ছিল। গঅঋঅর গাইডলাইন অনুযায়ী কৃষি জমির উপর সৌর বিদ্যুৎ করতে গেলে স্ট্রাকচার হতে হবে হালকা, শক্তিশালী এবং বড় ধরনের ঝড়, ভূমিক¤প প্রতিরোধে সক্ষম। এই ডিজাইনে প্রচুর জায়গা খোলা থাকে ফলে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে। উদ্ভিদ যাতে পর্যাপ্ত পরিমানে আলো পায় এবং কৃষি যন্ত্রপাতি যাতে সহজে আনা নেয়া করা যায় শেডের তলায় সেই পরিমান জায়গা রেখে ডিজাইন করা হয়। আকিরা নাগাশিমার করা গবেষণায় দেখা গেছে কৃষি শস্যের ক্ষেত্রে ৩২% পর্যন্ত ছায়া পড়লেও গাছের সুস্থ সবল বৃদ্ধি হয়। ফলে ডিজাইন করার সময় এমনভাবে প্যানেল স্থাপন করা হয় যেন নিচের ফসলে কোনভাবেই ৩২% এর বেশী ছায়া না পড়ে। এই পদ্ধতিতে ইতিমধ্যে জাপান সহ বেশ কয়েকটি দেশে বাদাম, আলু, গাজর, শসা, ফুলকপি, বাধাকপি, লেবু জাতীয় ফল চাষ হচ্ছে।

কাজুসাতসুরুমাই সোলার শেয়ারিং প্রোজেক্ট, মাকতো তাকাজাওয়া
আকিরা নাগাশিমার এই নতুন ধারনার কারনে জাপানের কৃষকরা তাদের ফার্ম ল্যান্ডে একই সাথে শস্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ফিড ইন ট্যারিফ কাঠামোয় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। যার ফলে প্রতি বর্গ মিটার জায়গার উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণের চেয়েও বেশী বেড়ে গিয়েছে।
এই একই পদ্ধতিতে সৌর বিদ্যুতের নিচে গবাদি পশুর খামার, মাছের খামারও করা সম্ভব। ফ্রান্সে মাছের খামারে শিকারি পাখির হাত থেকে মাছকে রক্ষা করার জন্য পরিক্ষামুলকভাবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পর দেখা গেল এটি একইসাথে মাছ রক্ষা করছে আবার গ্রিডে প্রচুর বিদ্যুৎও সরবরাহ করছে। অন্যদিকে জার্মানি এবং ইংল্যান্ডের খামারিরা গবাদি পশুর খামারের সাথেও সৌর বিদ্যুৎ করছেন। যা তাদের আয় বাড়তে সাহায্য করেছে, খাদ্য নিরাপত্তা ও জমির উৎপাদনশীলতা প্রায় দ্বিগুণ করেছে। বিস্তারিত জানতে পাঠক নিচের লিঙ্কগুলো দেখতে পারেন - 1. ÒJapan next-generation farmers cultivate crops and solar energyÓ, Junko Movellan, Renewable Energy.world.com, 10 October 2013, http://www.renewableenergyworld.com/rea/news/article/2013/10/japan-next-generation-farmers-cultivate-agriculture-and-solar-energy?cmpid=WNL-Friday-October11-2013
2. Ho MW. Harvesting energy from sunlight with artificial photosynthesis. Science in Society 43, 43-45, 2009.
3. Ò’Solar sharing’ spreading among Fukushima farmersÓ, The Japan News/ANN, 26 June 2013,http://news.asiaone.com/News/AsiaOne+News/Asia/Story/A1Story20130626-432406.html
4. Ho MW. Renewable ousting fossil energy. Science in Society 60 (to appear).
5. http://www.abb.com/cawp/seitp202/a007d66995f2a5d9c1257b05003a0a23.aspx


---

মাহবুব সুমন: প্রকৌশলী