শুক্রবার ২১ জুলাই, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

মৃত্যুতে নিঃশেষ নয় মহান বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রো

হাসান তারিক চৌধুরী
প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার, ০৯:১৪  পিএম

মৃত্যুতে নিঃশেষ নয় মহান বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রো

বিশ শতকের মহান বিপ্লবী বিশ্ব নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নশ্বর দেহের চির অবসান ঘটলো। তাঁর দেহভস্ম যখন কিউবার দক্ষিন পূর্বাঞ্চলীয় শহর সান্তিয়াগোতে সমাহিত করা হবে তখন বিউগলের করুণ মূর্ছনা অনেকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাবে। তারপরও কিউবার মহান বিপ্লবের কম্যান্ডারকে বিদায় দিতে হবে। এটাই বাস্তবতা। যে মানুষটির যোগ্য নেতৃত্বে কিউবার মানুষ মানবিক জীবনের স্বাদ পেয়েছে। মার্কিন দাসত্ব থেকে মুক্তি ছিলো যার জীবনের ব্রত। তাঁকে কি এতো সহজে বিদায় দেয়া যায়? তাইতো তাঁর দেহভস্ম বহনকারী শকটটি রাজধানী হাভানা থেকে ৯শ কিলোমিটার পরিভ্রমন করে কিউবার বিভিন্ন এলাকার মাটি ছুঁয়ে সান্তিয়াগোতে পৌঁছাবে। সেখানে ৪ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ৭ টায় তাঁকে সান্তা ইফিজেনিয়া নামের একটি সমাধিস্থলে সমাহিত করা হবে। একই স্থানে সমাহিত করা হয়েছে কিউবার আরেক মহানায়ক বিপ্লবী হোসে মার্তিকে। ফিদেল মার্তির চেতনাকে বিরাট মূল্য দিতেন। হয়তোবা এ কারনেই তাঁর চিরনিদ্রার জন্য এই সমাধিস্থলটি বেছে নেয়া হয়েছে। তাঁর অন্তেস্ট্যিক্রিয়ায় রাশিয়া, ভারত, ভিয়েতনাম, দক্ষিন আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সবকয়টি দেশ, জাপান সহ বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধিরা যোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এর নেতৃত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই), সিপিআই(এম) ও সমাজবাদী দলের নেতাদের সমন্বয়ে এক সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল এই অন্তেস্ট্যিক্রিয়ায় যাচ্ছে। যোগ দিচ্ছেন বৃটেনের উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী স্যার অ্যালান ডানকান এবং আইরিশ জাতীয়তাবাদী নেতা জেরি এডাম। ডাক পেলে ফিদেলের শেষকৃত্যে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বৃটিশ লেবার পার্টির প্রধান জেরেমি করবিন। সারা পৃথিবীতে কিউবান দূতাবাসে খোলা শোক বইতে বহু মানুষ প্রয়াত এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য লিপিবদ্ধ করেছে। এভাবেই সারা পৃথিবী এ মহানায়ককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে। এভাবেই ফিদেলের প্রতি মানুষ তাদের ভালবাসা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের বামপন্থীরা এবং বিভিন্ন স্তরের জনগনও তাঁর প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। যে ফিদেল ও তাঁর কিউবা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবলভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল। যে কিউবা যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের সাথে সাম্রাজ্যবাদের হুমকি মোকাবেলা করে বানিজ্য সহযোগিতা দিয়েছিলো। সে ফিদেলের শেষকৃত্যে যোগদানের মতো সৌজন্যবোধ বাংলাদেশ সরকার দেখাতে পারেনি। অথচ, মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাষ্ট্র সৌদি আরবের বাদশা আবদুল্লাহ বিন আজিজের শেষকৃত্যে যোগ দিতে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছুটে গেছেন। এতে ফিদেলের মর্যাদা এতোটুকু কমেনি। বরং মর্যাদা কমেছে বাংলাদেশের সরকারের। ফিদেলের মৃত্যুর খবরে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে যে সব পিশাচরা উল্লাস করেছে। অথবা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাক্তিরা যারা ফিদেলের মৃত্যুর কিউবা দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছেন তাদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুড়েই হবে।
ফিদেল এক প্রবল আলোকময় ধূমকেতুর মতো বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ হয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এক বিশাল উচ্চতায় উন্নীত হয়েছিলেন তিনি। কিভাবে তিনি বিশ্ব মানবতার কাছে এরকম অপরিমেয় শ্রদ্ধা ও ভালবাসার স্থানে পৌঁছালেন? নিঃসন্দেহে, এটি মানুষের কাছে বিরাট আগ্রহের বিষয় হয়ে রইবে। আমার মতে, সম্ভবত ফিদেলের সৎ ও সাদামাটা জীবন যাপন, দুঃসাহসী বিপ্লবী অভিযান এবং সাম্যের আদর্শের প্রশ্নে আপোষহীন অবস্থানই তাঁকে এরকম এক বিশাল উচ্চতায় উন্নীত করেছে। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আইনজীবী হিসেবে তিনি যখন পেশা শুরু করেন তখনও তাঁর মাথায় কাজ করেছিলো গরিব মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি। শোষিত মানুষের মুক্তির চিন্তা থেকে তিনি এক মুহূর্তও বিরত থাকতে পারেন নি। দুই বামপন্থী আইনজীবী বন্ধু জর্জ আজপিয়াজো এবং রাফায়েল রেসেন্দে কে নিয়ে তিনি যে ল’ফার্মটি খুলেছিলেন তার মূল উদ্দ্যেশ্য ছিলো গরিব কিউবানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেটি করতে যেয়ে তিনি তাঁর চেম্বার পর্যন্ত বেচে দিতে বাধ্য হন। বিদ্যুতের বিল দিতে না পেরে আসবাবপত্র বিক্রি করে বিল পরিশোধ করেন। এমনই দরদী মন ছিলো ফিদেলের। মাত্র ১৬৫ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি যখন মনকাডা আর্মি ব্যারাকে সশস্ত্র অভিযান চালান তখন নশ্বর এ জীবনের পরোয়া ক্যাস্ট্রো করেন নি। কারণ তাঁর চোখে মুখে তখন ছিলো বিপ্লবের অদম্য স্বপ্ন। মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা আর শোষণমুক্তির দুর্নিবার স্বপ্নই তাঁকে বিশ্ব নেতায় পরিণত করেছে। যে কারনে কমিউনিস্ট বা বামপন্থীরা ছাড়াও ভিন্নমতের মানুষের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবমুক্তির দিশারী এবং শ্রদ্ধার পাত্র। ফলে মৃত্যুর পরও অনেক শক্তি নিয়ে বেঁচে থাকবেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। কানাডার প্রধানমন্ত্রী সুদর্শন নেতা জাস্টিন ট্রুডো ফিদেলের প্রয়ানে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ ফিদেল ছিলেন এক কিংবদন্তির বিপ্লবী এবং অসাধারন বাগ্মী’। মাদাগাস্কারে এক সম্মেলনে দেয়া ভাষণে তিনি একথা বলেন। ২৬ নভেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস্ পত্রিকা লিখেছে, এ বক্তব্যের জন্য ট্রুডোর সমালোচনা করেছে মার্কিনের দুই উগ্র ডানপন্থী এবং বিগত নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশী সিনেটর টেড ক্রূজ এবং মার্কো রুবিও। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা বলেছেন, ‘একক ব্যাক্তি হিসেবে কিউবার জনগন ও পুরো বিশ্বের উপর ফিদেলের অসামান্য প্রভাবের কথা ইতিহাস মুল্যায়ন করবে’। এভাবেই নিজের গন্ডি ছাড়িয়ে ভিন্নমতের লোকজনের দ্বারাও ইতিবাচকভাবে মুল্যায়িত হয়েছেন ক্যাস্ট্রো। ল্যাটিন আমেরিকার আরেক কিংবদন্তী বিপ্লবী হুগো শ্যাভেজ তাই যথার্থই বলেছিলেন, ‘ফিদেলের বিশালত্ব এতো ব্যাপক যে তিনি আমাদের প্রতিটি বিপ্লবী কাজের অংশে পরিণত হয়েছেন। এসব কাজের মাঝেই তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন।
সত্যিই ক্যাস্ট্রো ছিলেন এক ব্যাতিক্রমী সাম্যবাদী যোদ্ধা, বিপ্লবী। তাঁর সারাটি জীবনের পরতে পরতে সে নজির খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক বিপ্লবী প্রথমে কমিউনিজমের দীক্ষা নিয়েছে। তারপর বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের কেউ সফল হয়েছে, কেউ হয় নি। ক্যাস্ট্রো ছিলেন তার ব্যাতিক্রম। তিনি আগে বিপ্লব করেছেন। পরে কমিউনিজমকে আদর্শ হিসেবে গ্রহন করেছিলেন। কারণ, তিনি তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, মার্কসবাদ-লেনিনবাদী মতাদর্শের বিশালত্বই পারে কিউবার বিপ্লবকে রক্ষা করতে। মৃত্যু অবধি তিনি সে বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর অনেকে টলে গেলেও তিনি টলেননি। বরং দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছেন, ‘হয় সমাজতন্ত্র, নয়- মৃত্যু’। ফিদেল মতান্ধ ছিলেন না। ছিলেন বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারের প্রতি এবং এর সৃজনশীল প্রয়োগের প্রতি গভীর আস্থাশীল। জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের এক অসাধারন ও সৃজনশীল প্রয়োগ ফিদেল বেশ সফলতার সাথে করতে পেরেছিলেন। ২০০৬ সালে কিউবার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেবার পর অসুস্থ শরীর নিয়ে অক্লান্ত ভাবে সমসাময়িক বিশ্ব ও রাজনীতি নিয়ে তিনি বিরামহীনভাবে লিখে গেছেন। তাঁর সেসব লেখা পৃথিবীর দেশে দেশে বিভিন্ন ভাষায় ছাপা হয়েছে। তিনি পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রকৃতি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি, রাজনীতি এবং অর্থনীতি নিয়ে তাঁর সেসব লেখা একুশ শতকের রাজনীতির জন্য এক অনন্য সাধারন সম্পদ। খেলাধুলার মতো বিষয়ও ছিলো তাঁর বিরাট আগ্রহের জায়গা। ২০১৪ সালের জুন মাসের ২৫ তারিখ তিনি ফুটবলের কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনাকে বেশ বড় একটা চিঠি লিখেন। কাগজে সে চিঠিটি ছাপাও হয়। এ যেন ক্রীড়ার দর্শনের উপর লেখা এক নিবন্ধ! খেলাধুলার জন্য বরাদ্দকে সমাজতন্ত্রে কখনোই আর্থিক মুনাফার ক্ষেত্র বলে বিবেচনা করা হয় না। ম্যারাডোনাকে লেখা তাঁর চিঠিতে সে কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর সাথে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী কলম্বিয়ান উপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকেজ এর। তাঁদের দুজনের বন্ধুত্বের নানা গল্প এখনো প্রচলিত। মারকেজ ছিলেন ক্যাস্ট্রোর রাজনীতির দারুন ভক্ত। ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে বন্ধুত্বের কারনে তাঁর পরিবারকে সিআইএ হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলো। দীর্ঘদিন মারকেজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেয়া হয় নি। নাইন ইলাভেনের হামলার পর মারকেজ রাষ্ট্রপতি বুশের উদ্যেশ্যে একটি লম্বা চিঠি লিখেন। তাতে তিনি বলেন, ‘এখন এই পৈচাশিকতা তোমার উঠোনে, তোমার প্রতিবেশির ঘরে নয়। তুমি কি বলবে?’ মারকেজ ক্যাস্ট্রো সম্পর্কে বলেছিলেন, আমি তাঁর মাঝে ল্যাটিন জাতির বীর সিমন বলিভারকে দেখতে পাই। তাঁর নেতৃত্বে ল্যাটিন আমেরিকা জয়যুক্ত হবেই’।
জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত মানব মুক্তির পথ হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রতি ক্যাস্ট্রোর ছিল অবিচল আস্থা। মৃত্যুর একবছর আগেও অসুস্থ শরীরে ‘মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হওয়া আমাদের অধিকার’ শিরোনামে তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেন। ফ্যসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৭০ তম বার্ষিকীকে উপলক্ষ করে ২০১৫ সালের ৮ মে সে প্রবন্ধটি বিভিন্ন প্রকাশনায় ছাপা হয়। সেখানেও তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধে ২ কোটি ৭০ লক্ষ সোভিয়েত জনগনের আত্মদান তাদেরকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং সমাজতন্ত্রী হবার অধিকার দিয়েছে। যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। লেনিন ছিলেন সেই সাহসী, মেধাবী বিপ্লবী কৌশলবিদ যিনি আংশিক শিল্পায়িত একটি দেশকে পুঁজিবাদী ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন এবং সর্বহারার একটি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন’। এরকম বিভিন্ন লেখা ছাড়াও ক্যাস্ট্রো প্যালেস্টাইনের জনগনের মুক্তি সংগ্রামের ন্যায্যতা, ন্যাটোর লিবিয়া হামলার প্রতিবাদ, আরব বসন্ত ও এর পরবর্তী ফলাফল, বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দা প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত লিখে গেছেন। যেসব লেখায় উল্লেখিত বিশ্লেসন পরবর্তীকালে সত্য বলে প্রমানিত হয়েছে। এতেই বুঝা যায়, রাজনীতিতে কতটা দূরদর্শী ছিলেন ফিদেল। সবাই জানে, ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্স এ জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘বন্ধু, ঘাতকরা সক্রিয় রয়েছে। ওরা তোমাকে হত্যা করতে পারে। তুমি সাবধান থেকো’। বাস্তবতা হৃদয়বিদারক হলেও বলতে হয়, ক্যাস্ট্রোর সে আশঙ্কা পরিনামে সত্যি বলে প্রমানিত হয়েছিলো। কারণ, রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করেই তিনি কিউবার বিপ্লবকে রক্ষা করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমসমূহই বলেছে, সাম্রাজ্যবাদ তাঁকে কম করে হলেও ৬শ ৩৮ বার হত্যার চেস্টা করেছে এবং ব্যার্থ হয়েছে। তিনি নিজের বাস্তবতা থেকে শিখেছেন, প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্রীদের জীবনের উপর আঘাত অনিবার্য। সে অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বংগবন্ধু শেখ মুজিবকে সতর্ক করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, চিলির সালভাদর আলেন্দে, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা কেউই রেহাই পান নি।
বিপ্লবী ক্যাস্ট্রো ঘাতকের বুলেটকে জয় করেছিলেন। হাভানা চুরুট ঠোঁটে, রাইফেল কাঁধে, গেরিলা পোশাকের এই আইকন এখনো সারা পৃথিবীর তরুণদের হৃদয় হরন করে। পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় সমাজতন্ত্রের লাল ক্যাকটাস ফুটিয়ে রেখে তিনি প্রমান করেছেন, উন্নয়ন মানে ৯৫ শতাংশ জনগনের রুটি রুজির অধিকার। ৫ শতাংশ জনগনের বিলাস বহুল গাড়ি আর আকাশচুম্বী ইমারতের নাম উন্নয়ন নয়। কিউবার উপর প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বিভিন্ন মিডিয়া জীর্ন হাভানা শহর আর পুরোনো মডেলের গাড়ির ছবি দেখায়। কিন্তু তারা এটা বলেনা, কিউবায় কোন গৃহহীন নেই, কেউ টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরে না, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বসেরা। সেখানে সবাই বিনা পয়সায় শিক্ষা পায়, কিউবায় জনগনের মধ্যে আকাশ পাতাল বৈষম্য নেই। এখানেই ক্যাস্ট্রোর সফলতা।
বিগত মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন প্রত্যাশী বামপন্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স নানাভাবে ক্যাস্ট্রোর অনেক কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। আমরা ৯৯ শতাংশ, অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট অথবা মজুরী বৈষম্যের বিরুদ্ধে মার্কিন তরুন সমাজের আজকের আন্দোলন যেন বিপ্লবী ক্যাস্ট্রোরই পদধ্বনি। ক্যাস্ট্রোর সমাজতন্ত্রের প্রশংসা করেছেন বৃটিশ লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। পুঁজিবাদী লুন্ঠন ও শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতী জনতার প্রতিটি সংগ্রাম ফিদেলের চেতনাকেই বহন করে। নতুন শতকে সাম্যের পৃথিবী গড়ার সংগ্রামে ফিদেল নিশ্চয়ই থাকবেন চেতনার অগ্নিমশাল হয়ে।
---
[হাসান তারিক চৌধুরীঃ সম্পাদক, বিশ্ব গনতান্ত্রিক আইনজীবি পরিষদ। ইমেইলঃ htarique@gmail.com]