মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

১৯৭১-এর ‘বাংলাদেশ যুদ্ধ’ : গণচীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

আলতাফ পারভেজ
প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার, ০৮:৩৭  পিএম

১৯৭১-এর ‘বাংলাদেশ যুদ্ধ’ : গণচীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সাহিত্যে মিথের রাজত্ব প্রবল। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। এখানে সবচেয়ে বেশি মিথ তৈরি হয়েছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পূর্বাপর নিয়ে।
একাত্তরকেন্দ্রিক একটি বড় মিথ হলো মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্থানীয়দের সমর্থন দিয়েছিল এব গণচীন ছিল বিরোধিতার ভূমিকায়। এইরূপ মিথের এমনতর একটি উপশাখাও রয়েছে যে, উল্লিখিত সোভিয়েত ভূমিকার কারণে মস্কোপন্থী স্থানীয় কমিউনিস্টরা প্রথম থেকে এ যুদ্ধে ব্যাপকভাবে শামিল ছিল আর চীনপন্থী কমিউনিস্টরা ছিল সর্বগ্রাসী বিরোধিতায়। এই মিথে সত্য-মিথ্যার কীরূপ সংমিশ্রণ ঘটেছে এ পর্যায়ে তার কিছুটা অনুসন্ধান করা প্রাাসঙ্গিক হবে।
২০১৫ সালে প্রকাশিত বর্তমান লেখকের গবেষণা ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী’তে পূর্ববাংলার একাত্তর অধ্যায়কে তৎকালীন বৈশ্বিক ‘ঠা-াযুদ্ধ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অভিপ্রকাশ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এও উল্লেখ করা হয়েছে, ওই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং অবশ্যই ভারতের ভূমিকা পুরোপুরি যার যার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থ দ্বারা তাড়িত ছিল এবং সেই কোন কোন দেশের ক্ষেত্রে এই ‘স্বার্থ’-এর একটি বড় একক উপাদান ছিল সামগ্রিক অর্থে ‘কমিউনিজম’ প্রতিরোধ এবং বিশেষ অর্থে মাঠপর্যায়ে ‘নকশাল’দের নিষ্ক্রিয় করা। যখনি তারা দেখেছে পূর্ববাংলার গণআন্দোলনে মাঠ পর্যায়ে শ্রেনীযুদ্ধের উপাদান রয়েছে তখন বিশ্বশক্তি সকলেই এর বিরোধিতা করেছে আর যখন সেই উপাদানকে পর্যাপ্ত উপায়ে নিবীর্য করা গেছে এবং নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটা কোন ‘বিপ্লব’ হচ্ছে না- তখনি সকল শক্তিধর নিরুদ্বেগে বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে উপরোক্ত ভূমিকা স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়া গেলেও রুশ ও চীনের অনুরাগীদের জন্য তা বিস্ময়কর বৈকি- বিশেষত যখন দেশ দু’টি দ্বিধাবিভক্ত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ‘নেতৃত্ব’ দিচ্ছিলো এবং বিশ্বজুড়ে ‘আদর্শবাদ’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যে আদর্শবাদের মূলকথা হওয়ার কথা শোষিতের আন্তর্জাতিকতাবাদ!
যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে চীনকে সাধারণভাবে পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে মনে করা হতো। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধ এই মিত্রতাকে পরোক্ষে ইন্ধন যুগিয়েছে। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সহানুভূতি ছিল ভারতমুখী। যদিও ভারতের ‘জোটনিরপেক্ষ’ একটি আলখেল্লাও ছিল। গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা থেকে গড়ে ওঠা পূর্ববাংলার মানুষের আন্দোলনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের কাছে এটা ছিল দেশটির ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’- বিশেষ কোন জনসত্তার ‘বিপ্লবী প্রচেষ্টা’ নয়। নির্মোহ ‘পর্যবেক্ষণ’ ছাড়া সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ এক্ষেত্রে ‘হস্তক্ষেপ’-এর তাৎক্ষণিক কোন কারণ খুঁজে পায় নি।

আদর্শবাদিতা ছাপিয়ে যায় যখন
আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থ
১৯৭১ সালে চীন পূর্ববাংলার সশস্ত্র সংগ্রামকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় চোখেই দেখেছে। কেন এই যুদ্ধ- তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা ছিল দেশটির কাছে- এই যুদ্ধ কৌশলগত আঞ্চলিক ভারসাম্যে এবং ‘বিশ্বব্যবস্থা’য় কীরূপ পরিবর্তন নিয়ে আসতে যাচ্ছে। চীনের তৎকালীন এইরূপ ভূমিকাকে চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বের্নার-অঁরি লেভি (১)। সেখানে আমরা দেখবো, একদিকে চীনের তৎকালীন নেতৃত্ব যখন সমাজতান্ত্রিক অতিবামপন্থার বুলি আওড়াচ্ছিলেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাওবাদীদের ওপর যখন তার প্রচ- প্রভাব পড়ছিল তখন বিদেশনীতির ক্ষেত্রে দেশটি অনুসরণ করছিল তথাকথিত ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতা’, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’-এর হাস্যকর সব নীতি।
এসময়ই প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিশেষ সহকারি হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর করেছেন(২) এবং নিক্সনের বেইজিং সফরের পটভূমি তৈরি হতে শুরু করেছে (৩)। স্বাভাবিকভাবে আশেপাশের অঞ্চলে বৈপ্লবিক আদর্শবাদ রফতানির চেয়েও চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যস্ত তখন। আর স্থানীয় বামপন্থীরা অনেকেই চীনের আদর্শবাদীতা ও বাস্তববাদীতার এইরূপ দ্বৈততাকে যথার্থভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। রাষ্ট্রের স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থকে পৃথক করার কথা ভাবেননি তারা। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের নকশাল আন্দোলন চীনের তরফ থেকে উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন পেলেও পাকিস্তানের পূর্ববাংলায় নকশালপন্থীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধীকারের সশস্ত্রতায় সে ছিল উদাসীন। কারণ পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা তার জন্য ততটাই জরুরি ছিল যতটা ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের অস্থিতিশীলতা।
প্রশ্ন ওঠে, স্থানীয় মাওবাদীরা চীনের এই ভূমিকাকে কি সেদিন নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করতে পেরেছিল? উত্তর হলো, না পারে নি। কারণ পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত ‘কূটনীতি’র ছক প্রতিনিয়ত পাল্টাছিল এবং তার পূর্বাপর ছিল অনেক সূক্ষ্ম ও জটিল। ঢাকায় সেনা অভিযানের প্রায় দু সপ্তাহ পর প্রথমে ৬ এপ্রিল ভারতকে মৃদু দোষারোপ করে একটি বার্তা পাঠায় চীন। এরপর ১১ এপ্রিল ‘পিপলস ডেইলি’তে প্রথমবারের মতো পূর্বপাকিস্তানের ঘটনাবলীকে এক লেখায় একে ‘বিদেশী হস্তক্ষেপে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের বিপন্নতা’ হিসেবে দেখে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন ছাপা হয়। আর পরদিন চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এক চিঠিতে পাকিস্তানের ‘চলমান অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে’ প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খানকে ‘পূর্ণ সহায়তা’র আশ্বাসবাণী পাঠান(৪)। কিন্তু এরপর দীর্ঘসময় বস্তুত চীনারা এক্ষেত্রে নীরবতার নীতিই নেয়- দু’একটি বিবৃতি দেয়া ছাড়া। ৫ নভেম্বর আট সহযোগীসহ ভূট্টো চীনে আসার মধ্যদিয়ে এ পর্যায়ের অবসান হয়েছে- এমনটিও বলা যায় না। কারণ ঠিক ঐ সময়ই ভারতীয় একটি পিংপং দলকে স্বাগত জানানো হয়েছিল চীনে। ভূট্টো সম্ভাব্য পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে তার দেশের পক্ষে চীনের ভূমিকা প্রত্যাশা করলেও সেরকম কোন আশ্বাসই মেলেনি। আর ১৪ নভেম্বরও চৌ এন লাই এক বিবৃতিতে চীন-ভারত বন্ধুত্বের চলমান বিকাশ চেয়ে এক বিবৃতি দেন। এমনকি একাত্তরের ২৫ অক্টোবর ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন’ যে পূর্ণসদস্যরূপে জাতিসঙ্ঘে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তাতেও ভারতের সমর্থনের অভাব হয়নি। ১৬ ডিসেম্বরের কেবল তিন সপ্তাহ আগে চীনের একজন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান যায়। বাংলাদেশ সংকট শুরুর পর এটাই ছিল পাকিস্তান-চীন সর্বোচ্চ যোগাযোগ। আর ২৬ নভেম্বরই কেবল জাতিসঙ্ঘে প্রথমবারের মতো চীন পাকিস্তান সংকটে ভারত ও সোভিয়েত ভূমিকার সমালোচনা করে। আর এর কারণও এই যে ততদিনে রুশ-ভারত মৈত্রী স্পষ্ট রূপ নিয়েছিল ৯ আগস্টের ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে।
এ পর্যায়ে আলোচনা সংক্ষিপ্ত করে আমরা বলতে পারি যে, ‘বাংলাদেশ যুদ্ধ’-এ রুশরা যখন বস্তুগত সহায়তা নিয়ে ভারতের পাশে দাঁড়ানোর আঞ্চলিক স্বার্থ খুঁজে পায় তখনি কেবল চীন মনে করেছে পাকিস্তানের পাশে তারও স্পষ্টভাবে দাঁড়ানো দরকার। কারণ তখন সে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদকে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে সম্প্রসারিত হতে দেখে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষত তিব্বতে মার্কিন সংশ্লিষ্টতা ইতোমধ্যে চীনের নজরদারিতে ছিল। সেটা আমরা আগেই বিস্তারিত উল্লেখ করেছি। এখন একই পরিসরে রুশদের ‘আগ্রহ ও সক্রিয়তা’ই যুদ্ধে চীনকে নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধ্য করে এবং তবে তা ব্যাপকভিত্তিক কোন সামরিক অবস্থান নয় অবশ্যই!
অন্যদিকে, পূর্ববাংলার জনগণের সংগ্রাম বা স্থানীয় মাওবাদী বিপ্লবীদের ইতোমধ্যে শুরু হওয়া সশস্ত্র সক্রিয়তা এক্ষেত্রে চীনের কোন দূরবর্তী বিবেচনা ছিল বলেও সাক্ষ্য মেলে না। পূর্ববাংলার সংকটে যুক্তরাষ্ট্রকে গোপনে এবং রুশদের প্রকাশ্যে নিজের পাশে আনতে পারা ভারতের বিশেষ কূটনীতিক সফলতা। স্বভাবত চীন নভেম্বর নাগাদ এক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পায়। সে পাকিস্তানের পাশে না দাঁড়িয়ে বাড়তি একাকিত্ব আমন্ত্রণ জানাতে চায়নি। এই ‘পাশে দাঁড়ানো’ও ছিল যতটা পারা যায় ন্যূনতম।

চীন-মার্কিন বন্ধুত্বে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল
সোভিয়েত ইউনিয়ন
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে মস্কো বিবাদমান কাউকে সরাসরি সমর্থন দেয় নি। একাত্তরের যুদ্ধের শুরুতেও এইরূপ মনোভাব বহাল ছিল। এটা খুব বিস্ময়কর নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ে মনে করতো পাকিস্তানে তাদের সমান্তরাল স্বার্থ রয়েছে(৫)। তবে যুদ্ধকালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের গোপন বিকাশ মস্কোকে তার নিরপেক্ষতা এবং উপরোক্ত ‘সমান্তরাল স্বার্থ’- থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ রাশিয়া ভারতীয় উপমহাদেশে তখন দুই প্রতিপক্ষকে একত্রিত হতে দেখে নিজের পক্ষে কৌশলগত ভারসাম্য আনায় বিশেষ উদ্যোগী হয়। তবে তার আগ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গী প্রভাবিত করতে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকার অনেকভাবে সচেষ্ট ছিল। বিশেষ করে মস্কোপন্থী ন্যাপের মোজাফফর আহমদ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মনি সিংহকে নিয়ে সরকারের জন্য একটি ‘উপদেষ্টা’ কমিটি গঠন করা হয়। এর অতিরিক্ত হিসেবে ন্যাপের দেওয়ান মাহবুব আলী, মোজাফফর আহমদ এবং সিপিবি’র আবদুস সালামকে যথাক্রমে বুদাপেস্ট, জাতিসংঘ ও মস্কোতে পাঠানো হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রশক্তিকে প্রভাবিত করার জন্য।(৬)

যুদ্ধের বিষয়ে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গী বিশেষভাবে পাল্টে যায় যখন ২৭ সেপ্টেম্বর ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে যান। ভারতের কথিত ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ এক্ষেত্রে কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আদতে এই নীতি ছিল দরকষাকষির জন্য দারুণ উপকারী। এর আড়ালে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেয়া যেত [যা দেখেছি আমরা তিব্বতি গেরিলা ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে] অন্যদিকে তেমনি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ সহায়তা চুক্তি করতেও কোন সমস্যা হয়নি।(৭) ১৬ ডিসেম্বরের পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশেও জোটনিরপেক্ষতার এইরূপ আড়ম্বর দেখা যায়- যার আড়ালে প্রতিযোগিতামূলকভাবে মার্কিন ও সৌভিয়েত প্রভাব কারোই নজর এড়ায়নি তখন। বলাবাহুল্য, কেবল লড়াকু বামপন্থীরা ছাড়া এইরূপ জোটনিরপেক্ষতা থেকে সকলে লাভবান হয়!
আমরা কী স্মরণ করতে পারি- সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম কবে বাংলাদেশ-যুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায়? সম্ভবত সেটা ৫ এপ্রিল। সোভিয়েত নেতা নিকোলাই পোদগোর্নি এই দিন প্রথম সোভিয়েত পক্ষে এ সংকটে অভিমত ব্যক্ত করেন। যেখানে ‘সংকট’-এর ‘শান্তিপূর্ণ সমাধান’ই কামনা করা হয়। এখানে ‘সমাধান’ মানে অবশ্যই দেশটির দুই অংশের ‘স্থিতি’। আর এইরূপ ‘স্থিতি’ না থাকার অর্থই হলো ‘চরমপন্থী’দের হাতে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া।(৮) আর শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত সমাধান না আসা সত্ত্বেও তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এটা বুঝতে দিয়েছিল যে, পূর্বাংশ বিচ্ছিন হলেও পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ ভারতীয় কবল থেকে নিরাপদ থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য এটাই তখন যথেষ্ট ছিল। কারণ পাকিস্তানের পূর্বাংশের বিচ্ছিন্নকরণ তাদের জন্য এমন কোন কৌশলগত স্বার্থ বিপন্ন করেনি যার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের ঝুঁকি নেয়া যায়।(৯) অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি সত্ত্বেও গ্রেমিকো সেপ্টেম্বরে যখন ওয়াশিংটন সফর করেন তখনও প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে নিশ্চিত করছেন যে, বাংলাদেশে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ চাইছে না তারা।(১০) তবে ৪ নভেম্বর ইন্দিরা গান্ধীর ওয়াশিংটন সফরের পরই বোঝা গিয়েছিল ভারতীয় বাহিনী সরাসরি পূর্ব-পাকিস্তানে ঢুকে পড়বে এবং এ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের মধ্যে পরোক্ষে এইরূপ সমঝোতা হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তান অক্ষত থাকছে।(১১)

খুশি ছিল রাশিয়া; সন্তুষ্ট ছিল চীনও
লক্ষণীয়, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন শুরু থেকে পূর্ববাংলার সংকটকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কৌশলগত বিবেচনা থেকে দেখেছে এবং শেষপর্যন্ত সেই বিবেচনাতে আটকে ছিল। নয় মাসের এই সংকটকালের শেষ কয়েকদিন ব্যতীত চীন শক্তভাবে পাকিস্তানের পাশে ছিল এমনটি কোন তথ্য দ্বারা সমর্থিত হয় না। বরং যুদ্ধের শেষ দু সপ্তাহ আগেও সে ছিল পক্ষাবলম্বের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত। চীন তার ‘মিত্র’কে বস্তুগত সহায়তা করেনি কিংবা ভারতীয় সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে পাকিস্তানকে নৈতিক সাহস দিতে যায়নি। ভারতীয় বাহিনী পূর্বপাকিস্তান নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরও চীন বলে যাচ্ছিলো এই ‘অনুপ্রবেশ’ অগ্রহণযোগ্য। (তবে) পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ অক্ষত থাকাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল।
অন্যদিকে, চীন পূর্ববাংলার মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত মাওবাদী গণযোদ্ধাদের প্রতিও বস্তুগত বা নৈতিক কোন সমর্থন দেয়নি। ‘এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরতদের প্রতি আমাদের সক্রিয় সমর্থন অব্যাহত থাকবে’- চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৯৫৬ সালের অষ্টম কংগ্রেসে মাও সেতুঙের ঐতিহাসক উদ্দীপনামূলক বক্তব্যের কোন কার্যকারিতা দেখা যায়নি বাংলাদেশ যুদ্ধে।(১২) অথচ সেরকম নীতি এই যুদ্ধকে একটি কার্যকর জাতীয় যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেত- কারণ তার আত্মগত শর্ত যথেষ্টই উপস্থিত ছিল। অন্তত ৫টি পিকিংপন্থী গ্রুপ তখন পূর্ব-পাকিস্তানে সক্রিয় ছিল। যারা সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষে প্রচারমূলক অবস্থান নিয়ে সত্তরের নির্বাচন বর্জন করেছিল। কিন্তু মার্চ থেকে পরবর্তী মাসগুলোতে এসে কেবল চীনের দুর্বোধ্য নীতি বাংলার শিক্ষিত ও রাজনৈতিক সচেতন তরুণদের মাঝে এই উপলব্ধি তৈরি করে যে, চীন স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ। ফলে একাত্তরের যুদ্ধকালে এবং যুদ্ধ শেষে বাংলার আনাচে কানাচে পরিবর্তনকামী তরুণদের মাঝে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শিক আবেদন মুছে যায়। নোয়াখালী অঞ্চলে তোয়াহা গ্রুপ, নরসিংদীতে কাজী জাফর ও মান্নান ভূঁয়াইদের গ্রুপ চীনের অবস্থান অগ্রাহ্য করেই সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে। সিরাজ সিকদারে অনুসারীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রসর ভূমিকায় ছিল। কিন্তু যশোর অঞ্চলে আব্দুল হকের দল এবং যুদ্ধের শেষপর্যায়ে মতিন-আলাউদ্দিনদের কর্মীরা বিভ্রান্তমূলক ও স্ববিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিতে শুরু করেন। তারা অনেকে নিজস্ব ক্ষুদ্র শক্তিকে দুই ফ্রন্টে বিভক্ত করে পাকিস্তানের সৈনিকদের পাশাপাশি মুজিবপন্থীদের বিপরীতেও নিয়োজিত হন। এর মাধ্যমে যুদ্ধসামর্থ্য কমে যায়; ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে। তাছাড়া সত্তরের নির্বাচনে যে জনগণ বিপুল সংখ্যায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল তারা মাওবাদীদের নতুন যুদ্ধকৌশলে গুরুতরভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। শেষোক্তদের রাজনৈতিক দিশেহারা অবস্থা এক পর্যায়ে এত প্রকট হয়ে উঠে যে, পাবনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে, কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে পাকিস্তান বাহিনীকে আর শত্রুজ্ঞান না করার কথাও বিবেচনা করছিলেন। আর এসবই ছিল পূর্ববাংলায় চীনের যুদ্ধকালীন ভূমিকার দূরবর্তী ও সদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ফলাফল।
অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নও চীনের মতোই একাত্তরে শুরুতে পূর্বপাকিস্তান সংকটে অতিন্যূনতম মনযোগী ছিল।(১৩) কিন্তু পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা দক্ষিণ এশিয়ায় তার কৌশলগত সম্প্রসারণের একটা সুবর্ণ দ্বার উম্মোচন করতে পারে কোন ধরনের সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত না হয়েই- এই নিশ্চয়তা পেয়েই তারা ভারতকে সামনে রেখে প্রক্সি যুদ্ধে শামিল হয়। যা এক পর্যায়ে অনিবার্যও হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্র-চীন উদীয়মান মৈত্রীর সম্ভাবনা দেখে।
মস্কো এই যুদ্ধের শেষমুহূর্তে ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধকে সংক্ষিপ্ত করতে সহায়তার পাশাপাশি চীন-মার্কিন সম্পর্কের বিপরীতে ভারতকে জয় করে নিয়েছিল। তবে এর চেয়ে তার বড় সফলতা ছিল বাংলাদেশীদের কাছে তার কৌশলগত স্বার্থ আড়াল করে সমাজতন্ত্রের নেতা সাজার সুযোগ তৈরি। ততদিনে কৃষক-বাংলায় চীনের ভূমিকায় খেই হারিয়ে ফেলা হতবিহ্বল মাওবাদীরা ক্ষয় পেতে শুরু করেছে এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে শুরু করেছেন মস্কোপন্থী হিসেবে গর্বিত ‘কমিউনিস্ট পার্টি’। যারা ‘জাতীয় বুর্জোয়া’র নেতৃত্বে ‘সা¤্রাজ্যবাদী বিরোধী জাতীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠা এবং অধনবাদী পথে ধাপে ধাপে সমাজতন্ত্র কায়েম করবে বলে বেশ বড় আকারের একটি কুহক তৈরি করতে পেরেছিল তরুণদের মাঝে।
যুদ্ধদিনে ভারতের পাশে দাঁড়ানো রুশদের ভূমিকা নবীন বাংলাদেশে এমন ইতিবাচক প্রচারণা পেল যে মস্কোপন্থীরা অনেকটা স্থায়ীভাবে স্থানীয় মাওবাদীদের বিপরীতে সমাজে নৈতিক কর্তৃত্ব পেয়ে যায়। যদিও শেষোক্ত অনেক আঞ্চলিক গ্রুপই ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকে সবচেয়ে স্বাবলম্বী সশস্ত্র সূচনার নায়ক। এ বিষয়ে বর্তমান অনুসন্ধানের অন্যত্র বহু দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। তবে সোভিয়েত ভূমিকায় ইতিবাচক ইমেজ সত্ত্বেও মস্কোপন্থী সমাজতন্ত্রীরাও যে কোন ধরনের বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি তার কারণ মুজিবকে অন্ধভাবে সমর্থনদানের নীতি। যে অদ্ভুত রাজনৈতিক নির্দেশনাটি মস্কো থেকেই এসেছিল। এভাবে কার্যত যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের তাৎক্ষণিক পরবর্তী সময়ে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ববাংলার আমূলপরিবর্তনবাদী রাজনীতির সবচেয়ে মোটাদাগে ক্ষতিসাধন করে।
-------

আলতাফ পারভেজ : গবেষক; ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’ (ঐতিহ্য) শীর্ষক গ্রন্থের লেখক। শিগগির প্রকাশিত হবে তাঁর আরেক গবেষণা গ্রন্থ ‘শ্রী লঙ্কার তামিল ইলম্ : দক্ষিণ এশিয়ায় জাতি-রাষ্ট্রের সংকট’।

তথ্যসূত্র:

১.বের্নার-অঁরি লেভি, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল, অনুবাদ: শিশির ভট্টাচার্য্য, আলিয়াঁস ফ্রঁসেস, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ৩১৯-৫৮।

২. ১৫ জুলাই ১৯৭১।

৩. শেষ পর্যন্ত এই সফরটি অনুষ্ঠিত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ এ। প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীনে তাঁর সফরকে অভিহিত করেছিলেন এভাবে : ‘এটা সেই সপ্তাহ যেদিন বিশ্ব পাল্টে যায়।’ বাস্তবে নিক্সনের সফরের মধ্যদিয়ে ঠা-াযুদ্ধকালীন ভারসাম্যে ব্যাপক পবির্তন নিয়ে আসতে সক্ষম হন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মাঝে দূরত্ব বাড়তে থাকে এসময়। এই সফরের মধ্যদিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে দীর্ঘ দু’দশকের যোগাযোগ খরার অবসান ঘটে।
৪. চৌ এন লাইয়ের এই চিঠির মেঠো ফলাফল ছিল বিধ্বংসী। কারণ ২৫ মার্চের পরপরই আওয়ামী নেতা-কর্মীরা যখন কলকাতামুখী তখন মাওবাদী গেরিলা গ্রুপগুলো মাঠে যুদ্ধে সক্রিয় হয়ে পড়লেও এই চিঠির বক্তব্য তাদের অনেককে বিভ্রান্ত করে। জনগণের স্বার্থ যে চীনের স্বার্থ বা চৌ এন লাইয়ের দিকনির্দেশনার চেয়েও বড়- সেই সাহসী উপসংহারে আসতে এদের অনেকেরই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ততদিনে মাওবাদীদের ব্যাপারে জনগণ ভাবতে শুরু করে যে, এরা যুদ্ধের প্রশ্নে দ্বিধান্বিতÑ অথচ পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণের মুখে প্রথম প্রতিরোধ অনেক জেলাতে এদের তরফ থেকেই ঘটেছিল।

৫. Luke A. Nichter and Richard A. Moss, Superpower Relations, Backchannels, and the Subcontinents, in `PAKISTANIAAT’, Ed : Dr. Cara Cilano and others, Vol-2, No-3, 2010, USA, p. 52.

৬. তালুকদার মনিরুজ্জামান, বামপন্থী রাজনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়, অনুবাদ: মো. সাহেব আলী ও এ কে এম কুতুব উদ্দিন, বাংলা একাডেমি, ২০০৭, ঢাকা, পৃ. ৫৯। এইরূপ এক সফর থেকে ফেরার পথেই দেওয়ান মাহবুব আলী বিমানবন্দরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। তাঁর অন্যতম সফর সঙ্গী ছিলেন ডা. সারওয়ার আলী।

৭. এই চুক্তি বাংলাদেশ যুদ্ধকে উপলক্ষ্য করে হয়েছে এটা বলা সত্যের অপলাপ। তবে বাংলাদেশ সংকট কালে পাকিস্তানের ‘মিত্র’ চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগ ভারতকে শংকিত করে তুলেছিল। এইরূপ একটি চুক্তি নিয়ে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে আলোচনা চলছিলো। ...আর শেষপর্যন্ত যখন এই চুক্তি হয় তা সামরিক দিক থেকে মোটেই ততটা নয় যতটা আদর্শিকভাবে ইন্দিরা গান্ধীকে যুদ্ধে যুক্ত হওয়া আরামদায়ক করে তোলে কারণ তাতে ‘সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন’কে ঢাল হিসেবে রেখে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববাংলা উভয়স্থানে কমিউনিজমের সংক্রমণ দ্রুত নির্মূল করা যায়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যা উল্টো ফল দিতো; আর রাশিয়া-ভারত চুক্তি না হলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ ছিল।

৮. বের্নার-অঁরি লেভি, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল, অনুবাদ: শিশির ভট্টাচার্য্য, আলিয়াঁস ফ্রঁসেস, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ৩১১।
এইরূপ ‘চরমপন্থী’দের রুখতেই এ সময় সমাজতন্ত্রী রাশিয়া শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েক সরকারকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিলো। শ্রীলঙ্কার এই চরমপন্থীরা ছিল জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)’র জাতীয়তাবাদী মার্কসবাদীরা। ১৯৭১-এর ৫ এপ্রিল এরা প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেয় এবং জুন পর্যন্ত তা টিকে ছিল। শ্রীমাভো বন্দরনায়েক সরকার চূড়ান্ত নির্মমতায় এই বিদ্রোহ দমন করে। জেভিপি’র প্রথম আঘাতে বন্দরনায়েক সরকার প্রায় ছত্রখান হয়ে গেলেও কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো পাকিস্তান ও ভারতীয় সেনাবাহিনী উভয়ে সরাসরি তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যায়। আর রাশিয়া বিদ্রোহীদের মূল ঘাঁটি এলাকাগুলো বিধ্বস্ত করতে ৫টি মিগ-১৭ এবং দু’টি কে-২৬ হেলিকপ্টার দিয়ে সহায়তা দেয়। বাংলাদেশ যুদ্ধক্ষেত্রে আপাত পরস্পর বিরোধী পক্ষগুলো শ্রীলঙ্কার মার্কসবাদী তরুণদের দমনে এভাবেই একত্রিত হয়ে গিয়েছিল একই সময়ে। ‘সকল’-এ মিলে এ সময় প্রায় পাঁচ হাজার ‘চরমপন্থী’কে হত্যা করে দেশটিতে ‘স্থিতিশীলতা’ কায়েম করে একাত্তর সালে। শ্রীলঙ্কায় সোভিয়েত সমাজতন্ত্রীদের সেদিনের ঐ ভূমিকা বাংলাদেশে কখনো আলোচিত হতে দেখা যায়নি।

৯. এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও আলোচনার জন্য দেখা যেতে পারে : দচঅকওঝঞঅঘওঅঅঞ’, ওনরফ, ঢ়. ৫০-৭৫. যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্র অঞ্চলে প্রধান কূটনীতিক লক্ষ্য ছিল চীনের সঙ্গে ‘নিবিড়তা’ তৈরি। সেই বিষয়ে আলোকপাত করে একই জার্নালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চযরষরঢ় ঙষফবহনঁৎম লিখেছেন (পৃ.১৭) : ‘‘From the point of view of the White House, I suspect, U.S. policy in South Asia in 1971 was a qualified success. The key goal of the opening to China was not jeopardized by other events on the South Asian subcontinent.’

১০.ibid, পৃ. ৫৪।
১১. ibid, পৃ. ৫৯।
১২.বের্নার-অঁরি লেভি, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩২৬।

১৩ এর পরোক্ষ প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রস্তুতিহীনতা। সিপিবি’র সেসময়কার কেন্দ্রীয় নেতা অজয় রায় আত্মজৈবনিক গ্রন্থে লিখেছেন : ...নির্বাচনের (১৯৭০) ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর ঘটনা প্রবাহ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চললো।...এসময়ে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ঘটনা প্রবাহের মূল্যায়নে পার্থক্য ছিল বেশ ব্যাপক।...স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলা উচিত কি না এনিয়ে দ্বিমত ছিল নেতৃত্বের মধ্যে। অজয় রায়, তীরের অন্বেষায়, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা,২০০৮, পৃ. ২৮৯-৯০। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-সিপিবি ঘরানার কর্মীরা যখন যুদ্ধের জন্য বাস্তব প্রস্তুতি নেন তখন যুদ্ধ প্রায় শেষ। এ বিষয়েও অজয় রায় উল্লিখিত গ্রন্থে (পৃ. ৩২১) আলোকপাত করেছেন।