বৃহস্পতিবার ২৩ নভেম্বর, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থল

ঢাকা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার, ০৬:৪৭  পিএম

কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থল

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৪ (ডয়েচেনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটডিই) -- বাঙালী জাতির অহংকার ও গৌরবের মাস ডিসেম্বর। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ মাসে ঘুরে আসুন বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেষা কোল্লাপাথর সমাধিস্থল।

এই সমাধিস্থলে দু’জন বীরউত্তম, একজন বীরবিক্রম ও দু’জন বীরপ্রতীকসহ মোট ৫০জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি রয়েছে। সমাধিস্থলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি রেস্ট হাউজ। আছে মসজিদ, হৃদয় আলোড়িত করবে সবুজ পাহাড়ের বৃক্ষ।

প্রতিদিন অগণিত দর্শনার্থীদের পদভারে সরব থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের শহীদ স্মৃতিভূমি কোল্লাপাথর এলাকা। আগত অনেকেই ১৯৭১ সালে দেশটির মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। আবার অনেকে মুক্তিযুদ্ধ না দেখেও হৃদয়ে ধারণ করতে চান সেই মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলো।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে কোল্লা পাথরে সারিবদ্ধভাবে নাম-ঠিকানা অনুসারে শহীদের কবর সাজানো হয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা খুব সহজেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বীরদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারছেন।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পুরো জাতির যেমন গৌরবের ও অহংকারের বিষয়, তেমনি বেদনাও রয়েছে। আমরা হারিয়েছি ৩০ লাখ বাঙালি সন্তানকে।

মুক্তিযুদ্ধকে জাতির সামনে তুলে ধরার মহান প্রয়াস নিয়ে এগিয়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধ ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কসবা কোল্লাপাথর সমাধিস্থল।

পূর্বাঞ্চলের ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কোল্লাপাথর এলাকায় শায়িত বীর শহীদের ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত সমাধিস্থলটি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যারা আমাদের স্বাধীনতা এনেছেন, তাদের মধ্যে ৫০জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এখানে।

একাত্তরে দেশমাতৃকার আন্দোলনে তারা জীবন দিয়ে শহীদ হন। তাদের স্মৃতি ও সমাধিস্থলের চারপাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় উঁচু-নিচু টিলা, নানা প্রজাতির বৃক্ষ, সামাজিক বনায়ন আর সবুজের সমারোহ পর্যটকদের দারুণভাবে কাছে টানে।

সমতল ভূমি থেকে বেশ কয়েকটি সিঁড়ি মাড়িয়ে মূল বেদিতে পা রাখার পর হাতের বাঁয়েই জাতির শেষ্ঠ সন্তানদের সারিবদ্ধ কবর।

সমাধিস্থল দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম জানান, ১৯৭১ সালের ৬জুন থেকে ওই বছরের সর্বশেষ ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যারা গেরিলা যুদ্ধ ও সম্মুখ সমরে শহীদ হন, তাদের মধ্যে এই ৫০ জনের মরদেহ পরম শ্রদ্ধায় তার পরিবারের সদস্যরা এখানে সমাহিত করেন।

৫ ডিসেম্বর এ এলাকা হানাদার দখলমুক্ত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক কোল্লাপাথর শহীদের স্মৃতি বিজড়িত কবর চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়।

১৯৮০ সালে সেখানে একটি কাঠের তৈরি রেস্ট হাউজ হয়। গত এক দশকে কোল্লাপাথরে গড়ে উঠে স্মৃতিসৌধ, মসজিদ, রেস্টহাউজ, সীমানা প্রচীর ও পুকুরঘাট। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলা পরিষদ এই কাজ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম জানান, ১৯৭২ সালে এই সম্পত্তির সর্ম্পূর্ণটাই সরকারকে দান করেছেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের বাবা আব্দুল মান্নান। একটি ছোট টিলার উপরে এই সমাধিস্থলটি।

কসবার এই এলাকাটি বাংলাদেশের একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। এ কারণে অঞ্চলটি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে অন্যতম লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। এখানে একজন বীরবিক্রম, দু’জন বীরউত্তম, দু’জন বীরপ্রতীকসহ মোট ৫০জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি রয়েছে বলে জানান তিনি।

এখানকার প্রতিটি কবরের শিয়রের পাশে লেখা রয়েছে মুক্তিযোদ্ধার নাম এবং ঠিকানা।

আব্দুল করিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে দুই নম্বর সেক্টরটি ছিল এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফ। এই সেক্টরের মাধ্যমে মোট ২২৬টি অপারেশন হয়।

কোল্লাপাথর সমাধিস্থল ছাড়াও আশপাশে ১১৫৫ জন শহীদের কবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

কোল্লা পাথর সমাধিস্থলে চিরনিদ্রায় যেসব বীর সেনানী আছেন তাদের নাম হল : ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার কুড়িপাইকা গ্রামের নোয়াব আলী, আখাউড়ার নীলাখাদ গ্রামের মোরশেদ মিয়া, আখাউড়া তুলাই শিমুলের তাজুল ইসলাম, ধাতুর পহেলার শওকত মিয়া, আমির হোসেন, আখাউড়া মান্দাইলের সিপাহী আনোয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁও বালিয়াডাঙ্গী কালমেঘ গ্রামের সৈনিক দর্শন আলী, আর কে মিশন রোডের (ঢাকা -৩) জাকির হোসেন (বীরপ্রতীক), কসবা জয়দেবপুরের আব্দুল জব্বার, সিলেট গহরপুরের হাবিলদার তৈয়ব আলী,

বগুড়া সারিয়াকান্দির ল্যান্সনায়েক আব্দুস সাত্তার (বীর-বিক্রম), বিজরা লাকসামের সিপাহী আক্কাস আলী, কোল্লাপাথরের ফখরে অলম, কসবা কামাল পুরের ফারুক আহম্মদ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া নবীনগর কুড়িঘরের মোজাহীদ নূরু মিয়া, ময়মনসিংহের মহাদানের নায়েক মোজাম্মেল হক,

নোয়াখালী মধ্যমকাচা গ্রামের নায়েক সুবেদার আব্দুস সালাম, ফরিদপুর পাঁচগাওয়ের সিপাহী মুসলীম মৃধা, শরিয়তপুরের নরিয়া গ্রামের প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম, কসবা মন্দভাগের আব্দুল অদুদ, কুমিল্লা মুরাদনগরের সিপাহী তমিজ উদ্দিন, হোমনার আবুল কাশেম, ব্রাক্ষণপাড়ার মোশারফ হোসেন, কুমিল্লা রামপুরের নায়েক সুবেদার মইনুল হোসেন (বীর-উত্তম), চাঁদপুরের মতলবের সিপাহী নূরুল হক, কসবা বড় বায়েক গ্রামের আব্দুল কাইয়ুম, কুমিল্লার সিপাহী হুমায়ুন কবীর, ব্রাক্ষণবাড়িয়া নবীনগরের ল্যান্সনায়েক আব্দুল খালেক, বগুড়ার ল্যান্স নায়েক আজিজুর রহমান, ব্রাক্ষণপাড়ার মো. তারু মিয়া, চট্টগ্রাম সন্দ্বীপের বেলায়েত হোসেন (বীর-উত্তম), এবং

কসবার বাউরখন্দ গ্রামের রফিকুল ইসলাম, কিশোগঞ্জ ভৈরবের আশুরঞ্জন দে, কসবা নিয়ামত পুরের আব্দুস সালাম সরকার, চাঁদপুর হাজীগঞ্জের জাহাঙ্গীর আলম, কসব সৈয়দাবাদ গ্রামের পরেশচন্দ্র মল্লিক, কুমিল্লা হোমনার জামাল উদ্দিন, কসবা শিকারপুরের আব্দুল আওয়াল, মাইখার আবেদ আহম্মদ, কুমিল্লা দেবিদ্বার ফতেয়াবাদ গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, হোমনা দৌলতপুরের ফরিদ মিয়া, ব্রাক্ষণবাড়িয়া বাঞ্ছারামপুরের মতিউররহমান, বুড়িচংয়ের রাজাপুর গ্রামের সাকিল মিয়া, চাঁদপু রহাইমচরের বিজয়পট্টির আনসার এলাহী বককর পাটোয়ারি (বীর প্রতীক), বাঞ্ছারামপুর আব্দুর রশিদ, কসবার মজলিশপুরের সিপাহী শহিদুল হক, কুমিল্লা দেবিদ্বারের উজানীচর গ্রামের সিপাহী আব্দুল বারী খন্দকার এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিনজন।

ওই সমাধিস্থলে রয়েছে নায়েক সুবেদার মইনুল ইসলামের কবর। তার নামেই ঢাকা সেনানিবাস এলাকার অতি পরিচিত মইনুল সড়ক নামকরণ করা হয়েছে।

এ সমাধিতে ৫০ জনের নাম রয়েছে এরমধ্যে ৪৭ জনের পরিচয় মিলেছে। অন্য তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রত্যেকের কবরের শিয়রে তাদের নাম-ঠিকানা লেখা রয়েছে। তা ছাড়াও কোল্লা পাথর সমাধিস্থলে প্রবেশ করে সামনে তাকাতেই শহীদের নাম-পরিচয় সংবলিত বিশাল ফলক চোখে পড়বে।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম বলেন, কোল্লাপাথরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থলে সরকারি বা রাজনৈতিক দলের কোনও কর্মসূচী না থাকলেও স্থানীয় এলাকাবাসী তাদের শ্রদ্ধা জানাতে ভোলেন না।

মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে শহীদদের আত্মীয়-স্বজনদের আগমন ঘটে এখানে। প্রতিবছর ১৬ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে কোল্লাপাথর স্মৃতিসৌধ এলাকাকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তোলা হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর এক অনন্য নিদর্শন হোক এই কোল্লাপাথর স্মৃতিসৌধ।

এএস/এমআরএফ