মঙ্গলবার ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮
deutschenews24.de
Ajker Deal

—বিশ্বজিতের মা—

রাউফুল আলম
প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০১৭ সোমবার, ০৪:৪৩  এএম

—বিশ্বজিতের মা—

আম্মার জন্য সম্প্রতি একটা আইপ্যাড পাঠিয়েছি। আমি যখন ল্যাবে যাই, আম্মাকে ভিডিও কল দেই। আমার ল্যাব ও অফিস দেখাই। আম্মা তাকিয়ে দেখে। এই দেখাতেই তার পরম শান্তি। আমি কী খাই, কখন ঘুমাই, কখন বাসায় ফিরি এগুলো সবই তার জানতে ইচ্ছে করে। এইসব জেনে জেনে, সে দূর থেকে সময় গুনে গুনে চিন্তা করে। কখনো যদি কাজের চাপের কথা বলি, আমাকে শান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। —একসময় বলবে, যা হবার তা হবে। এতো চিন্তা করিস না। যদি কখনো দুঃসময়/দুর্দিনের কথা বলি, তাহলে নফল নামাজ পড়বেন। রোজা রাখবেন। ঈদের সময় কান্নাকাটি করবেন। কতো কিছু খাওয়াতে পারেন না—এই আক্ষেপ করবেন। এই হলো আমার মা। আমাদের মা। বাঙালী মা। দুনিয়ায় এদের মতো সহজ-সরল মানুষ আর হয় না।

আমাদের মায়েরা আমাদের জন্য কী অসীম ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, সেটা লিখে শেষ করা যায় না। সন্তান যেমনই হোক, মায়েরা ভুলতে পারে না। মা দরিদ্র কিংবা ধনী হতে পারে কিন্তু মাতৃত্বের কোন ধনী-গরীব নেই। আমার মা যেমন আমাকে ভালোবাসেন, কল্পনা রাণী দাস তার ছেলেকে তেমনই ভালোবাসতেন। পূজা-পর্বণে ছেলের আসার জন্য দিন গুনতেন। চুলার ধারে বসে থেকে গরমে ঘামতেন। তবুও দিনভর রান্না করে যেতেন। কিন্তু তার ছেলে বিশ্বজিত এক হতভাগা। বর্বর, পাষণ্ড, নরখাদকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে তাকে। আমি যখন ছবিতে দেখি, বিশ্বজিতের মা কাঁদছেন—তখন একটা হাহাকার অনুভব করি। দেশের আনাচে-কানাচে এমন শত শত বিশ্বজিত হারিয়ে গেছে। তাদের মায়েরা অঝোরে কাঁদছেন। নিষ্পাপ, নিরাপরাধ ছেলেদের হারিয়ে পাগলপর হয়ে কাঁদছেন।

আমাদের তো এমন দেশ পাওয়ার কথা ছিলো না। যে দেশে সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে ঘুরে বেরাবে। রাজনৈতিক বাহুবল দেখিয়ে অপরাধ করেই যাবে। নিরীহ মানুষরা ধুক-ধুক বুক নিয়ে দিন কাটাবে। এইদেশে প্রধানমন্ত্রী আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছে। আইনমন্ত্রী আছে। তারা কী কখনো অনুভব করে না, তাদের সন্তানরা এভাবে খুন হয়ে গেলে তাদের কেমন লাগতো! একটা স্বাধীন দেশ, পঞ্চাশ বছরেও অপরাধ কমাতে পারে না—এটা বিশ্বাস করতে পারি না।

এই দেশটার আইন-বিচার সবই ধূসর-মলিন হয়ে গেছে। অর্থ ও ক্ষমতার কাছে বিচার নত হয়ে গেছে। গরীব ও ক্ষমতাহীনদের নিরাপত্তা নেই। ওরা বিচারও পায় না। একটা অসহায়, নিরপরাধ, নির্দোষ ছেলেকে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে মেরে ফেলা হলো। সে হত্যার ভিডিও প্রকাশ করা হলো। খুনিদের চিহ্নিত করা গেলো। তারপরও সকল খুনিদের ফাঁসি বহাল রাখা হলো না। —আহা স্বদেশ! আহা আমার বাংলাদেশ! দেশটা তো হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু সুবিচার দিয়ে কী বিশ্বজিতের মায়েদের বুকে সামান্য একটু শান্তিও দিতে পারে না এই অভাগা দেশ!

পৃথিবীর যে দেশ এমন অসহায়, সহজ-সরল মায়েদের কাঁদায়, সে দেশের কান্না কখনো বন্ধ হয় না। সে দেশের মানুষ কাঁদতেই থাকে। যুগের পর যুগ সেখানে অভিশম্পাত বর্ষিত হয়। মায়েদের অভিশাপের কোন ক্ষমা হয় না!
...
ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

 

রাউফুল আলম: পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার, ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়া