রবিবার ২৩ জুলাই, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

সরকার চায় যে বিএনপি নির্বাচনে আসুক- ওবায়দুল কাদের

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৭ সোমবার, ০৪:৪৫  এএম

সরকার চায় যে বিএনপি নির্বাচনে আসুক- ওবায়দুল কাদের

ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। দায়িত্বে আছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয়েরও। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ এই নেতা কথা বলেছেন, সাম্প্রতিক রাজনীতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে। এতে এসেছে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে সরকারি দলের অবস্থানের বিষয়টিও। দলীয় কোন্দল, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের মাপকাঠি ও মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক আলমগীর স্বপন

আলমগীর স্বপন : নির্বাচনী ট্রেনে এখন রাজনীতি? বলা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সেই ট্রেনের ড্রাইভিং সিটেই আছে ? কি মনে করেন?

ওবায়দুল কাদের : আমরা ট্রেনেই আছি। প্রস্তুতি আরও আগেই শুরু করেছি। এখন সেই প্রস্তুতি পুরোদমে এগিয়ে চলছে। আমাদের একদিকে বিভিন্ন আসনে সংসদ সদস্যদের কার কি অবস্থা- এ বিষয়ে জরিপ কাজ চলছ। সরকারি বেসরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থা জরিপ করছে।জরিপে পেশাজীবিরা যেমন আছেন তেমনি সরকারি সংস্থাও আছে। এর পাশাপাশি আমরা দলীয় পর্যায়েও খোজঁখবর নিচ্ছি,ক্লোজলি মনিটর করছি। পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজও এগিয়ে চলছে। আমরা বিভাগীয়ও জেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি সভা করছি। বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে শীগগিরই প্রতিনিধি সভা হবে। জেলা পর্যায়ে আমরা অনেকগুলো প্রতিনিধি সভা করেছি। এটা শুধু আনুষ্ঠানিক সভা নয়, কেন্দ্রিয় নেতাদের বক্তৃতা, ভাষনে সবকিছু সীমাবদ্ধ রাখিনি আমরা। তৃণমুলে নেতাকর্মীদের বক্তব্য শুনছি। তাদেরও প্রার্থী নিয়ে চিন্তাভাবনা আছে।সেটা তাদের আলোচনায় প্রকাশ পাচ্ছে। আবার নির্বাচনের সময় তৃণমুলকে একটা চয়েস দেয়া হবে প্রার্থী বাছাইয়ে। তারা প্রার্থী বাছাইয়ে তিন জন পর্যন্ত নাম পাঠাতে পারে। সেটা আমরা জরিপের সঙ্গে মিলিয়ে প্রার্থী বাছাই করবো এবং মনোনয়ন দিবো।


আলমগীর স্বপন : তৃণমুল পর্যায়ে অনেক সংসদ সদস্যই বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে খুন,দুর্নীতিসহ মাদক পাচারের অভিযোগ আছে ? কিছু কিছু জরিপেও এমন সংসদ সদস্য চিহ্নিত হয়েছে বলে জেনেছি। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয় আমলে নিবেন কিনা ? নতুন মুখ কি আসবে ?

ওবায়দুল কাদের : নতুন মুখ আসবে বেশকিছু আসনে। তবে কতটি আসনে পরিবর্তন হবে তা এখন বলতে পারছি না। এখন যারা আছে, তাদের কর্মকান্ডে যদি কোন ঘাটতি থাকে, জনমনে কাউকে নিয়ে যদি ইমেজ সংকট থাকে,তাদেরকে আমরা শুদ্ধ হওয়ার জন্য সময়সীমা দিয়েছি। আগামী ছয় মাসের মধ্যে তোমরা নিজেদেরকে ঠিক করে নেও। এ নির্দেশনা মোতাবেক যদি তারা নিজেদেরকে শুদ্ধু করে নিতে পারে, তাহলে আমরা অবশ্যই বিজয়ী হতে পারে এমন প্রার্থীকে মনোনয়নের জন্য অবশ্যই বিবেচনা করবো।

আলমগীর স্বপন : সরকারের গুরুত্বপূর্ন অনেক নেতা, মন্ত্রী তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা কি এবার মনোনয়ন বঞ্চিত হবেন ?

ওবায়দুল কাদের : আমি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী-এলাকায় আমারও যদি জনপ্রিয়তা না থাকে, আমি যদি বিজয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী না হই তাহলে আমি নিজেও মনোনয়ন নিবো না। জনগন না চাইলে আমি কেন দাড়াবো ?

আলমগীর স্বপন : কোন প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার যোগ্যাতা রাখে-এর মাপকাঠি কি হবে ?

ওবায়দুল কাদের : জনগনকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে প্রার্থীর কার্যকলাপ সম্পর্কে। আমি একটা এলাকায় পা দিলেই তো বুঝতে পারবো ওখানকার এমপি সম্পর্কে জনগনের কি ধারনা ? আজকাল মানুষ চুপচাপ থাকে না।

আলমগীর স্বপন : আওয়ামী লীগ পরপর দু’বার ক্ষমতায়। এবার তৃতীয়বারের জন্য লড়াইয়ে নামছেন। সেক্ষেত্রে আবার বিজয় অর্জন কতটা চ্যালেঞ্জের হবে ?

ওবায়দুল কাদের : সবকিছু তো ফেভারে থাকে না। আওয়ামী লীগ পরপর দু’বার ক্ষমতাসীন। তাই থার্ড টার্ম নির্বাচনে জেতা একটু কঠিন। এই সমস্যা সব দেশেই আছে। তুরস্কে এরদোয়ান প্রথমবার যেভাবে জিতেছেন দ্বিতীয়বার কিন্তু তার ভোট কমেছে। তৃতীয়বারে গিয়ে তার ভোট আরও বেশি কমেছে। অতিরিক্ত ক্ষমতার ব্যবহারের ক্ষেত্রে গণভোটে তার পক্ষে যে রায় এসেছে তা খুব বেশি ছিলো না। তাই তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা থাকে।তারপরও আমাদের একটা বিশ্বাস আছে। পচাঁত্তর পরবর্তী ২৮ বছরে যে উন্নয়ন হয়নি,সে উন্নয়ন আমরা গত তিন সাড়ে তিন বছরে করেছি।এ র রেকর্ড আছে এবং এটা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও প্রশংসিত।বাংলাদেশের লোকজনও জানে। শহরের ভোটারদের মধ্যে নানারকম টানাপোড়েন থাকে, একেকটা বিষয়ে আলোড়িত হয়, হলি আর্টিজান এটারও একটা প্রতিক্রিয়া থাকে, জীবনকে বদলে দেয় এরকম অনেক ঘটনা আছে। তবে গ্রামের চিত্র কিন্তু ভিন্ন। গ্রামের লোকেরা উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয় আর আচরণকে। উন্নয়নকে তারা নম্বর ওয়ান প্রায়োরিটি দেয়,নম্বর টু হচ্ছে আচরণ। এখন আচরণের জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারি যেহেতু আমরা ক্ষমতায়। ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার দাপট দেখানো এটা ক্ষতি করে।বিভিন্ন আসনের ক্ষেত্রে অবশ্য এর পার্থক আছে। এরপরও আমাদের একটা হিসেব আমরা করেছি। সেই হিসেবে আমরা হয়তো গতবারের মতো অত আসন আমরা পাবো না। তবে আসন কমলেও বিজয়ের ব্যাপারে আমরা সম্পুর্ন আশাবাদি।

আলমগীর স্বপন : আপনারা ক্ষমতায় আছেন। তাই অনেক আসনে ক্ষমতার দ্বন্ধও আছে। এর বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন সময় দেখা গেছে,দেখা যাচ্ছে। এই কোন্দল জিইয়ে থাকলে নির্বাচনে কি প্রভাব ফেলবে না ?

ওবায়দুল কাদের : কোন্দল নিরসনে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে।যেখানে দ্বন্ধ-সংকট আছে সেখানকার নেতাদের নিয়ে দু’একদিন পরপরই বৈঠক চলছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের ডেকে ডেকে নিয়ে মিমাংসা করছি,কথাবার্তা বলছি।এতে ফল পাচ্ছি।আমি যখনই ঢাকায় থাকি এবং আমাদের যারা সংশ্লিষ্ট যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক আছেন তাদেরকে নিয়ে আমরা প্রতিদিনই সংকট নিয়ে আলাপ আলোচনা করছি। যাকে যা বলার বলে দিচ্ছি।আর কোথায় সাংগঠনিক সংকট থাকলে এর মিমাংসাটাও আমরা এই বৈঠক থেকে দিয়ে দিচ্ছি।

আলমগীর স্বপন : তবে কিছু জায়গায় দ্বন্ধ সংকট লেগেই আছে। কোন কিছুতেই এর সমাধান হচ্ছে না মনে হয়। চট্টগ্রাম এর উদাহরণ হতে পারে।

ওবায়দুল কাদের : বড় দলে বড় কিছু দ্বন্ধ থাকবেই। এটা খুব স্বাভাবিক।কিন্তু আমাদের কর্মীরা সচেতন। এটা আমি এই অর্থে বলছি যে কিছু নেতা আছে যারা নবাগত, টাকা পয়সা আছে, নির্বাচন করতে চায়। আবার দলেরও অনেকের ইচ্ছা থাকতেই পারে নির্বাচনের। বড় দল, তাদেরও এমপি হওয়ার একটা স্বপ্ন থাকতে পারে, তারাও চেষ্টা করতে পারে। তবে আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি, এখন কোন প্রার্থী নেই, প্রার্থী হচ্ছে নৌকা। নৌকাকে প্রার্থী করে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, সেই আমাদের প্রার্থী। তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। আমাদের কর্মীদের এবার একটা বিষয় আছে, পেছনে ফিরে দেখার একটা তাগিদ আছে। সেটা হলো ২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে তখন আমাদের হাজার হাজার কর্মী ঘর ছাড়া হয়েছে। আমাদের ২১ হাজার নেতাকর্মী হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।আজকে বিএনপি গুম খুনের কথা বলে, সেই সময় আমাদের কতজন গুম হয়েছে- এর হিসেব নেই।কিবরিয়া সাহেব, আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো আমাদের প্রথম সারির অনেক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শুণ্য করার পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। সেই হামলায় আইভি রহমানসহ ২৩ জন নিহত হয়েছে। তবে এর প্রধান লক্ষ্য ছিলো আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা। এই তথ্যগুলো সবাই জানে। সেই বিভিষিকা, সেই অন্ধকারের ছবি খুব বেশিদিন আগের না। তাই আমাদের নেতাকর্মীদের এটা মনে আছে যে বিএনপি আগের মতো আবার ক্ষমতায় এলে কি হতে পারে। সেই ২০০১ সাল পরবর্তী যে অবস্থা হয়েছিলো এদেশে তার চেয়ে ভয়াবহ দুঃসময় নেমে আসবে। কাজেই এই বিবেচনায় আমরা ঐক্যবদ্ধ।এটাও আমাদের ঐক্যের একটা অনুঘটক।


আলমগীর স্বপন : সাংগঠনিক ঐক্য বা কার্যক্রমের জায়গা থেকে দ্রুত সহসম্পাদক নিয়োগের দাবি আছে নেতাকর্মীদের। শীগগিরই কি এই তালিকা ঘোষণা করা হবে ?

ওবায়দুল কাদের : এবার সহসম্পাদকের তালিকা আমি করে দিচ্ছি না। এক্ষেত্রে নেত্রীর নির্দেশ আছে। সহ সম্পাদক আমাদের প্রত্যেক যুগ্ম সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকের সাথে তিনজন করে থাকবে। আট বিভাগে ২৪ জন। ১৯টি সম্পাদকীয় পদ আছে। এর মধ্যে গুরুত্ব ও কাজ বিবেচনায় রেখে প্রতিটি পদের বিপরীতে সহসম্পাদক ৫জনের মধ্যে সীমিত থাকবে। কেউ তিন জন পাবে, কেউ চারজন কেউবা পাচঁজন পাবে। কিন্তু উপকমিটিটা হবে ২০ থেকে ৩০ জনের। এখানে এক্সপার্ট আসবে। আমাদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে যে সংসদ সদস্যরা আছেন,তারা এখানে চলে আসবেন। কাজেই এবার সদস্য থাকা নিয়ে কারো কোনো দ্বিধা থাকবে না। এসব ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে তালিকা জমা পড়ছে। জমা দিলে আমরা অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছি। এবার ওভাবে তালিকা দিবো না। তবে বলতে পারি সহ সম্পাদক এক’শর ভিতরে থাকবে। সদস্য অনেক থাকবে।

আলমগীর স্বপন : তবে গতবার সহসম্পাদকদের মান নিয়ে প্রশ্ন ছিলো ? তাদের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো ?

ওবায়দুল কাদের : গতবারেরটা গতবারের বিষয়। তখন বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কৌশলগত কারনে সীমারেখাটা ধরে রাখতে পারিনি।এবার আমরা সীমারেখার বাইরে যাবো না।

আলমগীর স্বপন : দল সংগঠিত করার পাশাপাশি জোট সম্প্রসারনে এবার আওয়ামী লীগের কৌশল কি ? আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্বে আছে। যেখানে বামপন্থী দলের প্রাধান্য। আবার বিপরীত মেরুর হেফাজতে ইসলামের সাথেও সম্পর্ক তৈরী হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের। তাদের নানা দাবি মানা হয়েছে।নির্বাচন এগিয়ে আসলে কি ইসলামী দলের দিকে আপনাদের ঝোঁক আরো বাড়বে ?

ওবায়দুল কাদের : জোটের বিষয়টা কৌশলগত। আমি একটা বিষয় অত্যন্ত পরিস্কার করতে বলতে চাই, যারা নানা সন্দেহ করছেন,তাদের জন্য স্পষ্ট করে বলতে চাই,সময়ের প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের কৌশলগত পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু আওয়ামী লীগ তার শেকড় থেকে কখনও এক বিন্দুও সরে যাবে না। আমরা আমাদের শেকড়ের বন্ধনে আবদ্ধ,এখান থেকে আমাদের সরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কৌশলগত পরিবর্তন আসবে, আমরা জাতীয় পার্টি বা ১৪ দলের শরীকরা বা আমাদের সাথে তরিকত ফেডারেশন আছে। এটাও তো ইসলামী দল। গতবার তারা আমাদের জোটে ছিলো। এরকম আরো অনেকেই আসতে পারে। তাই বলতে চাই নির্বাচনী যে জোট সেটা ভিন্ন জিনিস। জোটের একটা বড় প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব জনমনে থাকে। এখন বিএনপিও তো একটা বড় অ্যালায়েন্সের নেতৃত্বে আছে। এরশাদ সাহেবও একটা বড় জোটের কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে একেকটি রাজনৈতিক দলের একে হিসেব।

আলমগীর স্বপন : জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরীক ছিলো। আবার আপনাদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করছে। এরইমধ্যে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা আলাদা জোট গঠন করেছে ? তাহলে সমীকরনটা কি ? বিএনপি নির্বাচনে এলেও কি জাতীয় পাটি মহাজোটে না এসে আলাদা ভাবে নির্বাচন করবে ?

ওবায়দুল কাদের : জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত কোথায় থাকে সেটা হলো বড় কথা। আলাদা আলাদা জোট অনেকেই করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কে কোন জোটে নির্বাচন করবেন সেটা বোধহয় বলার বাস্তব সময় এখনও আসেনি।

আলমগীর স্বপন : জোট সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে কি কৌশল বা নীতি হবে আওয়ামী লীগের। এখন দেখা যাচ্ছে বাম-ডান-চরম ডান সবাইকে একই ছাতার নীচে আনার প্রক্রিয়া চলছে ?

ওবায়দুল কাদের : নির্বাচনী জোটের ক্ষেত্রে দুটি জায়গায় আমরা স্থির থাকবো-সেটা হলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যারাই আমাদের জোটে আসুক এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধু-এই দুটি মৌলিক জায়গায় এক থাকতে হবে। এসব বিষয়ে আমাদের সম মনস্কতার একটা বিষয় আছে।

আলমগীর স্বপন : রাজনীতির এখন মুল আলোচনা নির্বাচন কালীন সরকার কেমন হবে ? বিএনপি সহায়ক সরকারের কথা বলছে ? আপনারা কি ভাবছেন ? ফমুর্লা কি হবে ?

ওবায়দুল কাদের : কোন ফর্মুলা নেই। ফর্মুলা আমাদের সংবিধান। সংবিধানের ১১৮ ও ১১৯ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন পরিচালিত হবে, অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকালীন সরকার অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে হয়, বাংলাদেশেও ঠিক সেভাবে হবে। আমরা এখানে ভিন্নতর কিছু কেন আশা করছি? যে নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচন কমিশনকে আমরা গ্রহন করেছি। বিএনপি গ্রহন করেছে। তাই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন নেই। কোন কথাও হচ্ছে না। এর মানে বিএনপি একে মেনে নিয়েছে। যদি মেনে নেয়,তাহলে আগামী নির্বাচন এই কমিশনের অধীনেই যৌক্তিক।তখন যে সরকার থাকবে সেই সরকার একটা রুটিন মাফিক দায়িত্ব পালনের জন্য থাকবে। সেই সরকার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যে সংস্থা-প্রতিষ্ঠান আছে এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে। ক্ষমতাসীন সরকারের সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোন দায়িত্ব থাকবে না। কোন গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না, শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে। নির্বাচনের জন্য যা যা দরকার সেগুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত থাকবে।যেমন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এর কাজ তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার-সেটা তখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকবে। সেনাবাহিনীর যে দায়িত্ব সেটা নির্বাচন কমিশনই ঠিক করবে। তাই সে সময় যে সরকার থাকবে সেই সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোন ভূমিকা থাকবে না। তাহলে বিএনপির এখানে ভয় কিসের। আমি বুঝিনা তারা কেন ভয় পাচ্ছে? তাদের আমলে,তারা কিভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছে সেটা আমরা জানি। আজিজ মার্কা কমিশন সে সময় আমরা দেখেছি। ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটারের ইতিহাস এদেশে আছে, সেটা অন্তত আমাদের সময়ে হবে না।

আলমগীর স্বপন : বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য ২০১৪ সালে মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটা সংবিধানের অধীনেই ছিলো। এবারও কি বিএনপিকে মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দেয়া হবে? নির্বাচনকালীন মন্ত্রীপরিষদ কি ছোট হবে ?

ওবায়দুল কাদের : অন্তবর্তীকালীন সরকার সাধারণত ছোট হয়। তাই বলা যায় তখন মন্ত্রিপরিষদ ছোট হয়ে যাবে- বড় রাখার দরকার তো নেই। আরেকটি বিষয় যেটি বলছেন,নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অংশগ্রহন থাকবে কি না? আমি বলতে চাই,প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব দেবেন কিনা এখনও সে প্রয়োজন আমরা অনুভব করছি না। কারন বিএনপিকে গতবার ডেকে আমরা পজিটিভি কোন সাড়া পাইনি। শুধু গালিগালাজ পেয়েছি। বেগম জিয়া প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে নোংরা ভাষায় কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ভালোভাবে সম্বোধনও তিনি করেননি। এখনও তার মুখে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সম্মানজনক কথা শোনা যায় না। এভাবে রাজনীতিতে কি সমঝোতা হতে পারে। আপনার ছেলে মারা গেছে,আমি আপনার বাড়ির দরজায় গেলাম, সেখানে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন এটা যাদের মানসিকতা তাদের সাথে সমঝোতা কি করে হয় ?

আলমগীর স্বপন : তবে বিএনপির সেই মানসিকতার কি কিছুটা পরিবর্তন হয়নি ? তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির কারনে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে যায়নি।কিন্তু এখন তারা সহায়ক সরকারের কথা বলছে- ছাড় দিচ্ছে।সরকারের পক্ষ থেকেও এমন কোন ছাড় দেয়া হবে কিনা ?

ওবায়দুল কাদের : ছাড় দিচ্ছে কারন তারা এখন নো হোয়ার হয়ে গেছে। তারা কোথায়ও নেই। তাই এখন নানান কথা বলছে। তাদের নেতারা একেক দিন একেক কথা বলে। এক নেতা বলে যত বাধা আসুক, নির্যাতন আসুক বিএনপি নির্বাচনে যাবেই। আবার আরেক নেতা বেগম জিয়ার নির্দেশের কথা বলে হুমকি দেয় ,সহায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না। তাদের কথা যদি ধরি, তাহলে সহায়ক সরকার তো থাকছে। সরকারের হাতে তো কিছু থাকবে না,নাম মাত্র দায়িত্ব পালন করবে।

আলমগীর স্বপন : কিন্তু বিএনপি বলছে,প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অসীম। তাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে গ্রহনযোগ্য নির্বাচন সম্ভব না ?

ওবায়দুল কাদের : নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রীর কোন ক্ষমতা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী তখন ইচ্ছে করলেও মেট্রোরেল উদ্ধোধন করতে পারবেন না। নির্বাচনকালীন সময়ে মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পের কাজ যদি শেষও হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রীর তখন তা উদ্ধোধন করার সুযোগ নেই। রুটিন ওয়ার্ক করা ছাড়া তার কিছুই করার থাকবে না। কোন নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নিতে পারবেন না।


আলমগীর স্বপন : এরপরও তারা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলছে। সহায়ক সরকারের কথা বলছে ?

ওবায়দুল কাদের : আমরা নির্বাচনের আগে সংবিধান পরিবর্তনের চিন্তা ভাবনা করছি না। কারন বারে বারে এইসব আস্কারা দিলে দেশের শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিনি। তিনি কারচুপি করে, ষড়যন্ত্র করে, জালিয়াতি করে ক্ষমতায় আসবেন- এরকম মনমানসিকতা তার নেই। এটা তাকে ব্যাক্তিগতভাবে চিনি বলেই বলছি, শেখ হাসিনা এই কাজ করবেন না। বিএনপি এটা ভাবলে ভুল করবে। যদি এবারকার নির্বাচনটা শেখ হাসিনার অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু হয় তাহলে ভবিষ্যতে তারাও লাভবান হবে। তা না হলে তারা ক্ষমতায় আসলেও বিপদে পড়বে। আমি বলি শেখ হাসিনার অধীনে আগামী নির্বাচন একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হবে। আমি শতভাগ বিশ্বাস করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জনগনের রায়ের উপর কোন হস্তক্ষেপ করবেন না। বিএনপি অহেতুক ভয় পাচ্ছে। আমার মনে হয়, এই নির্বাচনটা তারা করুক। তারা দেখুক। তারা তো এখন কোথায়ও নেই। নির্বাচনে অংশগ্রহন করুক দেশবাসী স্বাক্ষী আছে। সারা দুনিয়া থেকে পর্যবেক্ষক আসবে। তারা দেখবে। সরকারের সাংবিধানিকভাবে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই। অহেতুক হস্তক্ষেপ করে একটা বিশৃংখলা সৃষ্টি করে দেশের ইমেজ নষ্ট করা-এই কাজটা আমাদের দ্বারা হবে না।

আলমগীর স্বপন : একটা অভিযোগ করা হচ্ছে যে, খালেদা জিয়াকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে বিএনপিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে সরকার। যাতে আগামী নির্বাচনে তারা পুরো শক্তি নিয়ে অংশ না নিতে পারে ?

ওবায়দুল কাদের: ষোড়শ সংশোধনী যখন বাতিল হলো তখন আপনি স্বাগত জানাচ্ছেন। বলছেন,বিচারবিভাগ স্বাধীন। তাহলে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় আপনার যদি শাস্তি হয় সেটা কেন আপনি মেনে নিবেন না।বিচার বিভাগ স্বাধীন আপনি বলছেন, তাহলে বিচার বিভাগ কি কেস টু কেস স্বাধীন। তাই আপনার বিরুদ্ধে মামলায় যখন রায় হবে তখনও তাহলে বিচার বিভাগ স্বাধীন-আমি সেটাই বলতে চাই।

আলমগীর স্বপন : নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ভাঙ্গার গুজবও আছে ? বলা হচ্ছে,সরকার বিএনপির একটি অংশ নিয়ে নির্বাচন করতে চায় ?

ওবায়দুল কাদের : বিএনপি ভাঙ্গলে তারা নিজেরাই নিজেদের দল ভাঙ্গবে। বিএনপির প্রতিপক্ষ তারা নিজেরাই। যাদের আপন ঘরে শত্রু তাদের শত্রুতা করার জন্য বাইরের শত্রুর কোন দরকার নেই। এটা জিয়াউর রহমানে সাহেবের দল। এখানে বেগম জিয়া,তারেক রহমান তারাই তো ডমিনেট করে। এখানে ভাঙ্গাভাঙ্গির যদি কোন প্রশ্ন আসে সেটা তাদের দলের নিজেদের দ্বন্ধের জন্য হতে পারে। তাদের দলের সিনিয়র নেতারাদের মাঝে এমনও সম্পর্ক যে কেউ কারো মুখের দিকে তাকাতে পারে না। তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়, নিজেরা নিজেদের সম্পর্কে নানান কথা বলে। এমনকি একজন আরেকজনকে সরকারের এজেন্টও বলে। এই সমস্যাটা আওয়ামী লীগে নেই। বিরোধী দলে থাকতেও ছিলো না, এখনও নেই। তাদের এই সংকটটা রয়ে গেছে। তাদের দল যদি ভাঙ্গে, তাহলে তা নিজেদের অর্ন্তদ্বন্ধের জন্য ভাঙ্গবে। আওয়ামী লীগের কোন প্রয়োজন নেই বিএনপিকে ভাঙ্গার।

আলমগীর স্বপন : বিএনপিকে নির্বাচনে আনার কোন বাড়তি উদ্যোগ বা কৌশল কি থাকবে সরকারের ?

ওবায়দুল কাদের : বিএনপি নির্বাচনে আসবে এটা আমরা চাই। বিএনপির মতো বড় দল প্রতিদ্বন্ধিতা করলে এই বিজয়েরও একটা দাম আছে। কাজেই আমরা চাই বিএনপি আসুক। আমরা ফাকাঁ মাঠে গোল দিতে চাই না। তবে বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না এটা তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়।এ জন্য বিএনপিকে কি আমরা করুনা বিতরণ করবো ? তাদেরকে হাত পা ধরে নির্বাচনে আনবো ? নির্বাচনে অংশগ্রহন করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এটা সুযোগ নয়।

আলমগীর স্বপন : বিএনপি না আসলেও কি ৫ই জানুয়ারীর মতো নির্বাচন আবার হওয়ার সম্ভাবনা আছে ?

ওবায়দুল কাদের : সরকার চায় যে বিএনপি নির্বাচনে আসুক।

আলমগীর স্বপন : নির্বাচনের আগে বা এবছরই মন্ত্রিপরিষদে কোন পরিবর্তন আসছে কি ?

ওবায়দুল কাদের : হয়তো একটা পরিবর্তন হবে। কিন্তু কখন হবে এটাতো প্রধানমন্ত্রীর ইখতিয়ার। তাই কবে হবে এটা নিয়ে অন্ধকারে ঢিল ছোড়া ঠিক হবে না। যখন হবে সবাই দেখতে পাবে,আকাশে চাদঁ উঠলে সবাই দেখতে পাবে। এসব ব্যাপারে যখনই আমি অনুমান বা ধারণার কথা বলবো তখনই মন্ত্রি পাড়ায় ঘুম থাকবে না। অযথা কেন বিপদে ফেলছেন। টেনশনটা অহেতুক না। সামনে আবার আরেকটা ঈদ আছে। আছি কি নেই-এই চিন্তাটা তো ভালো না। যারা মোর দেন শিওর তাদের ব্যাপার আলাদা। কিন্তু পরিবর্তনের আগে কথা বললে যারা হতে চায় তারাও টেনশনে থাকবে আর যারা আছে তাদের তো বাদ পড়ার টেনশন থাকবেই। কাজেই অহেতুক টেনশনে কাউকে ফেলতে চাই না।


আলমগীর স্বপন : ধন্যবাদ আপনাকে ।

ওবায়দুল কাদের : ধন্যবাদ আপনাকেও ।