রবিবার ২৩ জুলাই, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

সব জানার পরেও বদলায় না কেন বা রাষ্ট্রের ভাবাদর্শিক হাতিয়ার

সফিউর রহমান
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৭ শুক্রবার, ০৭:২৭  এএম

সব জানার পরেও বদলায় না কেন বা রাষ্ট্রের ভাবাদর্শিক হাতিয়ার


চারপাশে কী ঘটছে তা জানে না এমন কাউকে পাওয়া কঠিন। সবাই জানে এখানে মানুষ সততার ধার ধারে না। তারা জানে তাদের পাশের প্রবল প্রতাপশালী মানুষগুলো আসলে কতটা নোংরা। সবাই জানে এখানে এইভাবে সব কিছু চলতে থাকলে সামনে বিনাশ। এসব কারা ঘটাচ্ছে, কার জন্য, কে এর দায় টানছে – এসব কারো জানতে বাকি নেই। টকশো থেকে ফুটপাথের চায়ের দোকান তার সাক্ষী। কিন্তু তাহলে সবাই সব জানার পরও এই অবস্থা বদলায় না কেন?

এই বিশদ আলোচনাকে আমরা একটা সামাজিক ক্যাটাগরি ধরে বোঝার চেষ্টা করি। এই ক্যাটাগরি হল সততা। আধুনিক সমাজে ‘সৎ মানুষ’ বিষয়ক ধারণাটি একটা গোলমেলে, ধোয়াশাচ্ছন্ন প্রহেলিকাময় ধারণা। এখানে সৎ মানুষ চিহ্নিত হন ‘যথেষ্ট পরিমাণ অসৎ না হতে পারা’র নিক্তিতে। রাষ্ট্র এবং সমাজে সর্বব্যাপী লুটপাট, অন্যেরটা ছিনিয়ে নেওয়ার যে প্রকাশ্য এবং নির্বিকার প্রতিযোগিতায় হিংস্রভাবে অংশ নিতে ব্যর্থ মানুষটিকেই ‘সৎ মানুষ’- এর ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। এখানে সবার মধ্যে সুপ্ত আক্ষেপ ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মত বিরাজ করে- আমি কেন ওর মতো সফল ‘অসৎ’ হতে পারলাম না।

রাষ্ট্র যে অবস্থায় নিজেকে টিকিয়ে রাখে, তাকে তার শাসিত জনগণের মাঝে একটা মনোজাগতিক বৈধতা দিতে হয়। সে নিজে অসৎ। সে বলে যে এই রাষ্ট্র সকল জনগণের, কিন্তু আসলে সে কাজ করে অল্প কিছু মানুষের জন্য। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে শাসন করে তা সে রক্ষা করে না। ফলে তার অসৎ ব্যবস্থা সে জনগণের মনের মাঝে এমন করে হাজির করে যে প্রত্যকেই ভাবে – আমি যদি কোনভাবে এই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে যেতে পারি তাহলে আমিও সফল মানুষের কাতারে শামিল হতে পারব!এভাবে প্রতিটি মানুষ নিজে যে ব্যবস্থার বিরোধী, সর্বদা সে সেই ব্যবস্থার মধ্যে নিজের জায়গা খুঁজে নেয়ার ফিকিরে থাকে। প্রতিটি মানুষের কাছে সেই অসততা হয়ে পড়ে সফলতার নামান্তর। এই ধারণায় রাষ্ট্র একটা বর্হিস্থ মিথ্যা আবরণ তৈরি করে যা আদতে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে প্রতি নিশ্বাসে অসততা পুনরুৎপাদন করে চলে। রাষ্ট্রের এই প্রহেলিকা জনমানসে তৈরি করে সততার এক অলীক জগৎ। যে জগতে বৃদ্ধি পায় অসৎ হবার গুপ্ত বাসনা।

তাহলে বোঝা যাচ্ছে, রাষ্ট্র তার নিজের খাসিলত শাসিত জনগণের মনোজগতে সংক্রমিত করে যা আবার অণুদিত হয় তার বাস্তব দুনিয়ার কাজ-কারবারে। এই কাজ-কারবারের মধ্যে দিয়েই এই সমাজ আর রাষ্ট্র বহাল হয়ে থাকে। আমরা যে সমাজে থাকি সেই সমাজের একেকটা একক হচ্ছে একেকজন ব্যক্তি মানুষ। এই সামাজিক ব্যক্তি মানুষগুলো তার প্রতিটি কাজের মধ্যে দিয়ে সেই সমাজকে পুনরুৎপাদন করে, বহাল রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে।

মনে রাখতে হবে, সমাজ কখনোই স্ট্যাটিক না। ফলে যে সমাজকে আমরা স্থির মনে করছি তা আসলে প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল। হয় সে অধিকতর নেতিবাচক দিকে যাবে, অথবা ইতিবাচক শর্ত নির্মাণ করবে। একটা রাষ্ট্র এবং সমাজ কেবল আইন, আদালত, পুলিশ, প্রশাসন দিয়ে টিকে না। জবরদস্তি তাকে করতে হয়। কিন্তু কেবলমাত্র জবরদস্তি করে সমাজকে এক জায়গায় আটকে রাখা বা টিকিয়ে রাখা যায় না। একটা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে পুরো সমাজের সদস্যদের সম্মতি আদায় করতে হয়। সম্মতি আদায়ের কাজটা কেবল জবরদস্তি বা শক্তি প্রয়োগ করে হয় না। এ জন্য বিদ্যমান সমাজের চলমান ধারাকে মনোস্তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এই মনোস্তাত্ত্বিক সম্মতি আদায়ের কাজটা রাষ্ট্র করে শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপন, প্রচার মাধ্যম এমনকি চায়ের দোকানের আড্ডাসহ মানুষের দৈনন্দিন আলাপ-আলোচনায়। অন্যায় ব্যবস্থার স্বপক্ষে সম্মতি আদায় করতে সদা তৎপর থাকে কর্পোরেট ক্যারিয়ারের রঙ্গিন ফানুস। প্রচার মাধ্যমে সফল (? ) মানুষদের বানোয়াট জীবনী- জীবনাচরণ প্রচার এবং স্বীকৃতি প্রদান করে জনমানসে তৈরি করা হয় বিজাতীয় জগতের প্রতি স্বপ্ন। হাল জমানার ‘রিয়ালিটি শো’ ‘কৌন বনেগা ক্রৌড়পতি’ ‘সফল যারা কেমন তারা’, ‘তারকা জরিপ’, ‘সেরা গায়ক’, ‘তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, ’ খুদে গান রাজ` `তারকা মেলা ` ` সুপার স্টার ` ‘টিভি অ্যাঙ্কর, ‘বিউটি কনটেস্ট` `আইডল` `সেরা রাঁধুনী, ফ্লাশ মব, বাজারু শিল্পী-সাহিত্যিক আর বুদ্ধিজীবি - এমন অসংখ্য টুলস আর নানা পদক-পদবি, সম্মাননা দিয়ে মানসিক জগতের সম্মতি আদায়ের কারবার চলে। এ সকল কারবার জনমানসে প্রতিফলিত হয়ে বাস্তবে অনুদিত হয়। জনমানসের নিয়ন্ত্রণ এবং সম্মতি আদায়ে ব্যয় করা হয় কোটি টাকা। অবাক বিষয় হলো জনমানসের মানসিক সম্মতি আদায় এবং মনোজগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যয়কৃত অর্থের পুরোটাই কিন্তু আদায় করা হয় জনগণের পকেট থেকে! আধুনিক রাষ্ট্র আদতেই এক জাদুকরি প্রতিষ্ঠান।

জনমানসের সম্মতি আদায় এবং মনোজগত নিয়ন্ত্রণের এই কারবার টিকে রাজনৈতিক পরিভাষায় বলা হয় ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট এ্যাপারেটাস’ (Ideological State Apparatus)। বাংলায় ‘রাষ্ট্রের ভাবাদর্শিক হাতিয়ার’। এই কারবারের ধারণাটি দেন মার্ক্স-শিষ্য ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুজের ( ১৯১৮ - ১৯৯০)।

রাষ্ট্র ও সমাজের মাঝে জাকিয়ে বসা দুর্নীতি, নিপীড়ন, লাম্পট্য, প্রবঞ্চনা, জোচ্চুরি, হঠাৎ ধনী হবার খায়েশ, নাম-খ্যাতির লোভ রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং বন্ধু মহল কর্তৃক স্বীকৃত। বহাল অন্যায্য ব্যবস্থার মধ্যে একটু জায়গা করে নিয়ে বিজাতীয় ভোগ আর অলীক জীবনযাপনের যে প্রাণান্ত চেষ্টা তা এই আইডিওলজিক্যাল স্টেট এ্যাপারেটাস দিয়ে জনমনে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে ন্যায্যতা প্রদান করা হয়েছে। বিনিময়ে রাষ্ট্র নিয়েছে জনগণকে শাসন-শোষণ-নিপীড়ন আর লুটপাটের জন-সম্মতি। অসততার এই চলমান প্রক্রিয়া সমাজে স্বীকৃত, কার্যকর পন্থা হিসেবে বিরাজমান। সমাজের বৃহত্তর অংশই নির্বিশেষে মানসিকভাবে মেনে নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করে।

রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বব্যাপী লুটপাট, অনিয়ম, লাম্পট্য, শোষণ, নিপীড়নের পরেও জনগণের স্তরে কোনো দৃশ্যমান এবং আশা জাগানিয়া প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নেই কেন - এ প্রশ্ন তোলার সময় উপরে বলা তীব্র এবং তিক্ত সত্যগুলো আমাদের নিজেদের পর্যালোচনার মধ্যে স্থান দিতে হবে।

সফিউর রহমান: অ্যাক্টিভিস্ট ও গবেষক