মঙ্গলবার ৩১ মার্চ, ২০২০
deutschenews24.de
Ajker Deal

ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসে না- দুদক চেয়ারম্যান

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল ২০১৭ শুক্রবার, ০৫:০০  পিএম

ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসে না- দুদক চেয়ারম্যান

ইকবাল মাহমুদ। প্রশাসনে দীর্ঘ কর্মজীবন তার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে অবসরের আগে দায়িত্বে ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে।এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) বিকল্প নির্বাহী পরিচালকও ছিলেন।দেশে বিদেশে ২৪ টি দপ্তরে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ নিয়োগ পান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে।১৪ মার্চ যোগ দেন দুদকে। দায়িত্বের প্রথম বছরে দুদককে কতটুকু এগিয়ে নিয়ে গেছেন,কোথায় ব্যর্থতা ছিলো কিংবা ভবিষ্যতে কি করতে চান এ নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেছেন ঢাকার যমুনা টিভির বিশেষ প্রতিনিধি আলমগীর স্বপনের সঙ্গে।।

আলমগীর স্বপন : দুদকে দায়িত্বের দ্বিতীয় বছরে পা রেখেছেন।সামনে কিভাবে এগুতে চান, নতুন কোন লক্ষ্য-পরিকল্পনা আছে কি ?
ইকবাল মাহমুদ : প্রথম বছরের কথা এক কথায় যদি বলতে হয়,এটা চ্যালেঞ্জিং ছিলো।একটা জিনিসের স্টার্ট আপ টাইম বা গজিয়ে ওঠার সময় থাকে সেটা আমি বা আমরা সে অর্থে পাইনি। কারন দুর্নীতির বিষয়টা এতো জ্বলন্ত বিষয় যে এর স্টার্টআপের সময় নাই। তাই আমাদেরকে এসেই শুরু করতে হয়েছে।গত বছরে আমরা যে খুব একটা কিছু করতে পেরেছি সেটা বোধহয় না। তবে কিছু যে করতে পারিনি সেটা বলাও বোধহয় ঠিক না।জনসাধারণ,সুশীল সমাজ এবং যারা দুর্নীতি করতে পারেন বা করেন সবাইকে আমরা একটা বার্তা দিতে চেয়েছিলাম যে,কেউ ধরা ছোয়ার বাইরে না,দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে এটা যেন কেউ মনে না করে।আমার মনে হয় এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সফলতা আছে। আর ব্যর্থতার কথা যদি বলেন,সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা জনগনের আস্থা এখনও আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে,পাবলিক ট্রাস্ট বিল্ড করতে হয়তো একটু সময় লাগবে। তাই দ্বিতীয় বছরে আমাদের মুল ফোকাসটা থাকবে,হাউ টু বিল্ড পাবলিক ট্রাস্ট।
আলমগীর স্বপন : দ্বিতীয় বছরের শুরুতে দুর্নীতিবাজদের কি বার্তা দিতে চান ?
ইকবাল মাহমুদ : বার্তা তো সহজ।কেউই মনে করবেন না যে আপনি আইনের উর্ধ্বে এবং আপনাকে স্পর্শ করা যাবে না। আপনার বিত্ত বৈভব রয়েছে অথবা আপনি ক্ষমতাবান সেই কারনে আইন আপনাকে স্পর্শ করবে না,এই মনোভাবটা পরিবর্তন করুন।আমার স্পষ্ট কথা। কেউই যেন মনে না করেন আমিসহ আমরা বা আমি আইনের উর্ধ্বে।
আলমগীর স্বপন : কিন্তু ক্ষমতাবানরা দুদকে পার পেয়ে যায়-এমন ধারনাই প্রচলিত।আপনি এখানে যোগ দেয়ার আগে নিশ্চয়ই শুনেছেন,অনেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে ‘দায়মুক্তি কমিশন’বলে। আগের কমিশনের কাজ কর্ম দেখে কি মনে হয়েছে আসলে ওই পর্যায়ে গিয়েছিলো ?
ইকবাল মাহমুদ : (একটু হেসে,সময় নিয়ে ) এতো কঠিন প্রশ্ন করলে তো সমস্যা। দায়মুক্তি না, আসলে একেকটা মানুষের ধারনা একেক রকম।আপনি কোনটাকে অপরাধ বলবেন,কোনটাকে বলবেন না,এটা একটা কাইন্ড অব পারসেপসন বা ধারনা।যারা আগে ছিলেন তাদের একরকমের অবস্থান ছিলো,হয়তো আমাদের আরেকরকমের অবস্থান।এটা আসলে নির্ভর করে। দায়মুক্তির বিষয়টা ঢালাওভাবে বলাটাও বোধহয় সঠিক নয়।দায়মুক্তি নয়, হয়তো কারো বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।সেটা আমরাও করে থাকি। এটা আমার মনে হয় কিছুটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সবগুলো এফআইআর বা মামলাই যে চার্জশীটে পরিনত হবে তা না। তবে থিউরিটিক্যালি ফর এ্যান্টি করাপশন কমিশন এফআইআর হলে চার্জশীট হওয়াটাই উচিত।এটা বাঞ্চনীয়,বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া।সব সময় রুলের বাইরেও কিছু ব্যাপার থাকে। একজন ভদ্রলোক যদি মারা যান,সেক্ষেত্রে তো আপনি তার বিরুদ্ধে চার্জশীট দিতে পারবেন না। তাই দুদকের মামলা তখনই করা উচিত,যখন বিশ্বাস হবে যে, কোর্টে আপনি এটা প্রমাণ করতে পারবেন,আপনার কাছে তথ্য প্রমান আছে।এসব বিষয় মাথায় নিয়েই আমরা এখন মামলা করার চেষ্টা করছি।
আলমগীর স্বপন : তাহলে কি বিষয়টা এমন যে অভিযোগ আছে,কিন্তু প্রমাণ করতে পারবেন না আদালতে-এ কারনে অনেক সময় দায়মুক্তি হয়ে যায় ?
ইকবাল মাহমুদ : দেখেন,দুর্নীতি ছিলো,দুর্নীতি আছে,দুর্নীতি থাকবে-এটাতো সত্যি।এখন হয়তো প্রশ্ন করবেন তাহলে কি হবে?আসলে বিষয়টা হচ্ছে মাত্রার।দুর্নীতির মাত্রা এমন পর্যায়ে গেছে যে, আপনি কোনটা ধরবেন,কাকে ধরবেন,কাকে ছাড়বেন।আপনি যদি নৈতিকতার প্রশ্নে আসেন,আপনি যদি কাজের যে পদ্ধতি,সেই পদ্ধতিতে আসেন,সবকিছু মিলিয়েই আপনাকে ধারণা করতে হয় যে দুর্নীতি কোনটা।এখন দুর্নীতির যে ব্যাপ্ত পরিসর,সেই পরিসরে আপনি কোনটা ধরবেন,কোনটা ধরবেন না-এ নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে।দুর্নীতির ব্যাপকতা এমন জায়গায় চলে গেছে আপনি যেটাই ধরেন না কেন সেটাই ধর্তব্য।যে কারনে আপনি যাই ধরেন,মানুষ কিন্তু অত বিশ্বাস করে না যে,দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু করছে।মানুষের যে আস্থার সংকট এক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের বলতে হচ্ছে যে,দুদকের ১ হাজার ৭৩ জনবল দিয়ে এই ১৬ কোটি মানুষের দেশের দুর্নীতির মুলোৎপাটন আপনি করতে পারবেন না।এই কারনে আমাদের মৌলিক দর্শন হচ্ছে,বিল্ডিং অ্যাওয়ারনেস।
আলমগীর স্বপন : সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার মানে দুর্নীতি।আপনি সিভিল প্রশাসনে ছিলেন। এখন দুদকের চেয়ারম্যান। দু’ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায় কি বৈপরিত্য আছে ?
ইকবাল মাহমুদ : আসলে রিকনসাইল বা মেলানো এক্ষেত্রে খুবই কঠিন। ওইটা (প্রশাসন) একটা পরিস্থিতি ছিলো।এটা আরেকটা।ওখানে আমি আসামীর কাঠগড়ায় ছিলাম,এখানে আমি ধরেন বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ।এক্ষেত্রে একটা কথা স্পষ্ট বলে দিতে চাই,কর্মকর্তা যদি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ধারন করেন,তাহলে তার ওপরের পর্যায়ে যে অথরিটি থাকুক না কেন,দুর্নীতি হতে পারবে না।আজ (বৃহস্পতিবার)সরকারি একজন কর্মকর্তার একটি অভিযোগ নিয়ে শুনানী ছিলো। সেই কর্মকর্তা বলেছে,তার উপর চাপ ছিলো। এক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন ছিলো,আপনি চাপে পড়ে কাজ করলেন কেন ? বললো,আমি যদি পেনশন না পাই। তার মানে আপনার টেনশন হলো,পেনশন যদি না পান। এই পেনশন না পাওয়ার বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন,কিন্তু আপনি যদি এখন মামলায় পরে যান,তাহলে কি হবে ? নাম বলতে চাই না,আমাকে একবার অনেক উচ্চ পদের একজন বলেছিলেন,দেখো কোন মন্ত্রনালয়ের যদি কোন কর্মকর্তা,শক্ত অবস্থান নেয় তাহলে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কিছু করার থাকে না ?আমি বিনা বাক্যব্যয়ে বলেছিলাম,স্যার সঠিক।আসলে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা সঠিক পথে এবং নৈতিকতা,মুল্যবোধের ওপর দাড়িয়ে যদি নিজের কাজটা করেন,দুর্নীতি হওয়ার কোন প্রশ্ন নেই। যদি না আপনি নিজে কোন দুর্নীতি করেন। আপনারা হয়তো জানেন,সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের মেয়াদের ২৫ বছর আগে চাকুরীচুত্য করা যায় না। হ্যাঁ তাকে বদলি করা যেতে পারে। কিন্তু এটা তো স্বাভাবিক,আপনি চাকরিতে আছেন বদলিতো হবেই আপনার।
আলমগীর স্বপন : তাহলে কি বলা যাবে,সরকারি কর্মকর্তাদের কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে বিভাগীয়ভাবে তাকে সাজা দেয়ার বিধানটি দুর্বল বা নমনীয় ?
ইকবাল মাহমুদ : আমরা গতবছর যে সুপারিশ করেছি,তাতে বলেছি বদলির একটা নীতিমালা করতে হবে।উদাহরন হিসেবে বলা যায়,ভারতে চাইলেও কাউকে আপনি বদলি করতে পারবেন না।সেখানে একটি কমিটি আছে,একটা চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের প্রশ্ন সেখানে আছে। আমাদের এখানে এমনকিছু করতে হবে।আমরা সরকার বাহাদুরকে বলছি,একটা সুনির্দিষ্ট মডেল বদলী নীতিমালা তৈরী করুন।সেই নীতিমালা অনুযায়ী চলুক।তাহলে ওই চেয়ারের ভালোবাসা,প্লাস চাপ আর থাকবে না।উনি (সরকারি কর্মকর্তা ) সাহসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। ওইটুকু স্বাধীনতা তাকে দিতে হবে।
আলমগীর স্বপন : দেখা যায় যে,যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে বা ক্ষমতাসীন যারা তাদের দুর্নীতির খোজঁ খবর দুদক বলতে গেলে করেই না। আপনার কমিশনও একই স্রোতে ?
ইকবাল মাহমুদ : আপনাকেই জিজ্ঞেস করি,ক্ষমতাসীন বা ধরুন আমি যখন এই কমিশনে আছি,আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করাটা আসলে কঠিন।যারা ক্ষমতাসীন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো আসে না। আপনি কয়টা পত্রিকার রিপোর্ট পেয়েছেন যে,অমুক অমুক রাজনীতিবিদ এই দুর্নীতি করেছে।এরকম রিপোর্ট নাই বলতে পারেন। যেগুলো আছে, সেগুলো আমরা কগনিজেন্স বা আমলে নিয়েছি। এক্ষেত্রে উদাহরন হতে পারে,১০ টাকার চাল নিয়ে যে দুর্নীতি হয়েছে।এই অভিযোগে অনেক রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের বিরুদ্ধে চার্জশীট হয়েছে। আমরা তদন্তে আছি,তদন্তের স্বার্থে এখন নাম বলতে পারছি না।তাই এটা সত্যি না।রিপোর্ট করেন,আমরা ব্যবস্থা নিবো। আমরা তো বাসায় গিয়ে গিয়ে আর খুজেঁ বের করতে পারবো না।
আলমগীর স্বপন : দুদক আইন অনুযায়ী এক্ষেত্রে অভিযোগ ছাড়াও স্বপ্রনোদিত হয়ে দুর্নীতির অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে ?
ইকবাল মাহমুদ : এটা একটা ভালো প্রশ্ন করেছেন।স্বপ্রনোদিত হয়ে মানে অতি উৎসাহী হয়ে কাজটা করা,এটা সঠিক না।তবে হ্যাঁ,এখানে একটা জিনিস সমস্যা হয়ে গেছে এই কমিশনে,এক বছরে আমি যা দেখলাম এখানে কোন ইন্টিলেজেন্স ইউনিট নেই। একটা ইন্টিলিজেন্স ইউনিট থাকলে কোন সেক্টরে কি হচ্ছে না হচ্ছে এর একটা খতিয়ান বা চালচিত্র আপনি পেতেন।তখন আপনি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করতে পারতেন।এখন তো সেটা নেই। এর ফলে স্বপ্রনোদিত হয়ে আমরা যে একটা তদন্ত করবো,সেই কাজটা আসলে হচ্ছে না।এখন দরখাস্ত আর আপনাদের রিপোর্টর ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু আপনারাই বা কতগুলো রিপোর্ট করেছেন। আসলে বাস্তবতা হলো,আমি যখন ক্ষমতায় থাকি,ফাইল তো আমার কাছে থাকে,সব তথ্য আমার কাছে সংরক্ষিত। তাই আপনি কিভাবে দুর্নীতির তথ্য পাবেন,যেখানে আমি আছি। আমি চলে যাওয়ার পর আপনি আমার দুর্নীতির সব তথ্য পাবেন-এটাই কারন। তাই প্রায়ই দেখবেন যে দুর্নীতির খোজঁখবর আউটগোয়িং গর্ভনমেন্টের বিরুদ্ধে হয়।
আলমগীর স্বপন : এছাড়া আইন অনুযায়ী দুদক চাইলে যে কারো সম্পত্তির হিসেবে নিতে পারে।জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা সম্পদের হিসাব জমা দেন,এর সাথে পরবর্তী সময়ের অর্থ বিত্তের হিসেব দুদক চাইলে কি নিতে পারে না ? অন্তত যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির জনশ্রুতি আছে ?
ইকবাল মাহমুদ : একটা প্লেটে যদি আপনি অনেকগুলো বিরিয়ানি নিয়ে রাখেন,খেতে পারবেন না।এটা (দুদক) একটা ছোট প্রতিষ্ঠান,আপনি যদি এতো কিছু নিয়ে অগ্রসর হন,কোনটাই করতে পারবেন না।এতো সম্পদের হিসাব নিয়ে আপনি কি করবেন ? এখানে কিছু কথা আছে,এনবিআর সম্পদের হিসাব নিচ্ছে,আবার আপনি নিচ্ছেন-আইনের প্রেক্ষাপটে এতে কিছু দ্বন্ধ তৈরী হয়।এজন্য সরকারকে বলেছি,আমরা এক্ষেত্রে আসলে কি করবো ? আমরা কোনদিকে যাবো এখনও নিজেরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।আমরা সম্পদের হিসাবটা কিভাবে নিবো,কিভাবে নিবো না,এটা আমরা এখনও চিন্তাভাবনা করছি।তবে আমরা কাজ বন্ধ রাখিনি,গণভাবে হয়তো হচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা সম্পদের হিসাব চাই।আর একটা জিনিস ট্যাক্সের জায়গাটা ঠিক না হলে আপনার সম্পদের হিসাব নিয়ে খুব বেশি লাভ হবে না।ট্যাক্স যে দিতে হবে,এই সংস্কৃতি আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি।অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু ট্যাক্স জিডিপি রেসিও খুবই কম।আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য,দেশের উন্নয়নের জন্য এটা আরো বেশি হওয়া দরকার। স্বনির্ভরতার জন্য এটা দরকার।
আপনি একটা ট্যাক্স জমা দিলেই না বিকল্প তৈরী হয় আস্তে আস্তে,তখন সম্পত্তির হিসাবটা নেয়া সহজ।কিন্তু হুট করে এখন সম্পত্তির হিসাব চাইলে কোথায় কি আছে আপনি বলতে পারবেন না।আপনার টিভি কোথায় কবে কিনেছেন,সেটার হিসাব কোথায়,ট্যাক্সে দেখিয়েছেন কিনা,এতে অনেক ধরনের সমস্যা।তাই আমরা মুলত এনবিআরকে বলেছি,আপনারা ট্যাক্স আদায় ঠিক রাখেনে। এনবিআর ট্যাক্সমেলা করছেন,ট্যাক্সের হার বাড়ছে। আমি আশা করছি আরো বাড়বে। বাড়লে পরে হয় কি নিদির্ষ্ট লোকের হিসাবটা আমরা নিলে,আর তার সম্পত্তি কি আছে দেখা যায়।তাই আপনি ট্যাক্স ঠিক করেন,দুর্নীতি অনেক কমবে। কারন ট্যাক্সে প্রতিবছর আপনাকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।তাই দুর্নীতি ওখানে অনেক কমে যাবে।
আলমগীর স্বপন : ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সরকারি দলের সাবেক ও বর্তমান ছয় জন সংসদ সদস্যের সম্পদের হিসাব নিয়েছিলো দুদক?
ইকবাল মাহমুদ : সম্ভবত তিন চার জনের অভিযোগ এখনও চলমান আছে। তবে এখনই নামটা বলতে পারবো না।একটা জিনিস মনে রাখবেন,আমরা কমিশন কিন্তু নাম টাম দেখিনা।এই অভ্যাসটা আমরা করতে চাইনা,যে নাম দেখে কাজ করা।আসলে ফ্যাক্ট দেখে কাজ করা উচিত।এই কারনে অনেক নাম মনে থাকে না।ওই ব্যাক্তি কি করেছে সেটা দেখা উচিত,এক্ষেত্রে নামের বিষয়টাকে গুরুত্ব দেই না।
আলমগীর স্বপন : সামনে আমরা কি দেখবে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী,যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে তাদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিচ্ছেন ?
ইকবাল মাহমুদ : আপনারা দেখছেন তো প্রভাবশালী যাদের অনেক বিত্ত বৈভব রয়েছে,তারাও একটা মেসেজ পাচ্ছেন,যে সবসময়-সব দিন বিত্ত বৈভব দিয়ে পার পাওয়া যায় না। আবার এটাও দেখেছেন বিশেষ করে গতবছর ২০১৬ সালে,ক্ষমতা দেখিয়েও সব সময় পার পাওয়া যায়নি।বহু ক্ষমতাধর ব্যাক্তিকে আমরা আইনের কাছে নিয়ে গেছি।বহু বিত্তবৈভবের মালিক এমন লোককেও আমরা আইনের কাছে নিয়ে গেছি।
আলমগীর স্বপন : এক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। দেশটির দুর্নীতি নির্মুল কমিশন (কেপিকে) ২০০৪ থেকে ২০০৯-এই পাচঁ বছরে যাদের দুর্নীতির ঘটনা তদন্ত করেছে,বিচার প্রক্রিয়া ও অভিযোগ প্রমাণ করেছে তাদের মধ্যে ছিলেন ৪৫ জন এমপি,৮জন মন্ত্রী,৮জন প্রাদেশিক গর্ভনর,১জন গর্ভনর,৩জন বিচারক,৪জন কেন্দ্রিয় ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর,২৭ জন মেয়র,অ্যাটর্নী জেনারেল অফিসের ৩জন প্রসিকিউটর,দূত ও কাউন্সেল জেনারেল এবং ১জন পুলিশ প্রধান।আমাদের দেশে রাজনৈতিক সরকারের আমলে এমন নজির তো বলতে গেলে নেই ?
ইকবাল মাহমুদ : সময় দিতে হবে আপনাকে।হুট করে একটা কিছু করলেন।এরপর আবার ফিরে আসবেন,এমন পরিস্থিতির মধ্যে আমরা কোন সময় পড়তে চাই না।আমরা দেখে শুনে বুঝে করতে চাই।আর ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাপট এক রকম,আমাদেরটা আরেকরকম।সেখানেকার রাজনীতি,সামাজিক অবস্থা আরেক রকম।তাই ইন্দোনেশিয়ার সাথে মেলালে হবে না।আবার ইন্দোনেশিয়ার অন্য চিত্র আপনারা জানেন কিনা। এখন ইন্দোনেশিয়ায় আগের মতো কেপিকে (দুর্নীতি নির্মুল কমিশন) কাজ করতে পারছে না।আমরা সে পর্যায়ে যেতে চাই না।ইন্দোনেশিয়ায় অনেক কিছু করেছে কেপিকে,কিন্তু কেপিকে এখন মোটামুটি একটা স্থবির প্রতিষ্ঠান। আমি যখন গিয়েছিলাম দেখেছি,তারা তখন মন্ত্রনালয় গুলোর সাথে এমওইউ করছে যে তোমরা আমাদের তথ্য দিবে।অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগে তাদের যে অ্যাপ্রোচ ছিলো,সেখান থেকে সরে এসেছে।তাই আমরা সরে আসার অ্যাপ্রোচে যেতে চাই না।চিন্তাভাবনা ছাড়া এবং সকলের সম্মতি ছাড়া আমরা ওই পর্যায়ে যাবো না।এক্ষেত্রে রাজনৈতিক,সামাজিক ও গণমাধ্যমের সম্মতি প্রয়োজন।যে কারনে আমরা বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান করছি মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য।কারন দুদকের জনবল কম। আমাদের জনবল মাত্র ১ হাজার ৭৩ জন,তদন্ত কর্মকর্তা ৩’শ আর কমিশন তিন জনের।তাই আমাদের বুঝতে হবে,এটার পক্ষে এতোকিছু করা সম্ভব না।
আলমগীর স্বপন : কিন্তু এই সক্ষমতা দিয়েই উদাহরন সৃষ্টি করার মতো কিছু কাজ কি দুদক করতে পারে না ?
ইকবাল মাহমুদ : উদাহরন সৃষ্টি হবে এবং হয়েছে। আপনারা এতোদিন আমাদেরকে প্রশ্ন করেছেন চুনোপুটি ধরছেন ? কিন্তু বড় মাছ কি ধরি নাই আমরা ? গত এক বছরে যে ৪৩৮ জন গ্রেফতার হয়েছেন এর মধ্যে ছোটও আছে,বড়ও আছে।তাই ওই প্রশ্নটা করার সুযোগ নেই যে,বড় নাই শুধু ছোটই ধরছেন। তবে কমিশন কাউকে গ্রেফতারের কথা বলে না। এটা তদন্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত।মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তের প্রয়োজনেই তারা অভিযান চালায়।
আলমগীর স্বপন : এক্ষেত্রে বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি মামলা নিয়ে দুদকের কার্যক্রমে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ আছে,ঋন প্রক্রিয়ার সাথে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু যুক্ত থাকলেও তাকে মামলা আসামী করা হয়নি। দীর্ঘদিন হলেও এখনও এ সংক্রান্ত মামলা গুলোর তদন্ত রিপোর্ট দেয়া হয়নি ?
ইকবাল মাহমুদ : এটা তদন্ত কর্মকর্তার বিষয়।আব্দুল হাই বাচ্চুর কথা আমাকে কেউ বলেও নি।এটা সম্পূর্ন নির্ভর করবে তদন্তের উপরে এবং তদন্ত কর্মকর্তার ওপরে। আমাদের কাছে যদি সেটা আসে আমরা সেটা বিচার বিশ্লেষন করবো এবং সত্যিকার অর্থে যাদের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জড়িত নাই অথচ আমরা চার্জশীট দিবো-এটা হবে না,এই বেআইনী কাজ আমরা করবো না। আর আমি যতটুকু জেনেছি শীগগিরিই বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি মামলার তদন্ত রিপোর্ট দেয়া হবে।
আলমগীর স্বপন : বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি নিয়ে আব্দুল হাই বাচ্চুকে দায়ী করে সংসদে খোদ অর্থমন্ত্রী বক্তব্য রেখেছিলেন। সংসদীয় কমিটির অভিযোগের তীরও তার দিকে ছিলো ?
ইকবাল মাহমুদ : সেটা অন্য ইস্যু। মাঠের কথা এক রকম আর কাগজের কথা এক রকম ।
আলমগীর স্বপন : এছাড়া কমার্স ব্যাংকের একটি মামলায়,আসামী ব্যাংক কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও মূল আসামী একজন এমপিকে গ্রেফতারে দুদকের পিছুটানের অভিযোগ আছে ?
ইকবাল মাহমুদ : সেই এমপির ক্ষেত্রে কোন বাধা ছিলো না। আমাদের অভিযানের আগে সে জামিন নিয়ে ফেলেছে।এছাড়া সংসদ অধিবেশন চলার সময় কিছু বিধি বিধান আছে। আইনটা দেখতে হবে। তবে এতে একজন এমপিকে গ্রেফতারে কোন বাধা আছে বলে আমি জানি না।
আলমগীর স্বপন : বিভিন্ন আমলেই দুদকের রাজনৈতিক ব্যবহার দেখা গেছে ? বিশেষ করে বিরোধী দলে যারা থাকে তাদের বিরুদ্ধে দুদকের খড়গ নামে। অভিযোগ আছে,বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দু’টি মামলা নিয়ে দুদক খুবই তৎপর। কিন্তু সরকারি দলের কারো কারো দুর্নীতি মামলার চার্জগঠনই হচ্ছে না ?
ইকবাল মাহমুদ : এটা দুদকের বিষয় না। এটা বিজ্ঞ আদালতের বিষয়। এ ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নেই।মামলা তদন্ত ও অনুসন্ধানের বিষয়ে আমার বক্তব্য আছে। কিন্তু মামলার চলমান প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞ আদালতের সিদ্ধান্তে আমার কোন প্রশ্ন নেই।
আলমগীর স্বপন : তাহলে কি দাবি করছেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে এখন দুদককে ব্যবহার করা হচ্ছে না ?
ইকবাল : এগুলো অনেক আগের কথা।এখনতো আর তাদের (বিএনপি) বিরুদ্ধে সেরকম অভিযোগ নাই।কারন আগের গুলোর তদন্ত হয়েছে,মামলা হয়েছে। আমি তো আর পুরোনো জিনিস ঘেটে বের করবো না।মানে পুরোনো কিছু আর আমার কাছে নাই। ৩১ আগস্টের মধ্যে মোটামুটি সবই শেষ। আর রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ নীতিনির্ধারক যখন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষনে বলেন,দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে কাজ করছে ।কথা সম্পূর্ন সত্য। আপনি এতোক্ষন বসে আছেন,কোন টেলিফোন পেয়েছেন আমার মোবাইলে,এই যে আমার ফোন এখানে কি ফোন এসেছে। বাংলাদেশে তো অনেক লোক আছে সচিব মন্ত্রী-এটা একটা উদাহরন। কোন রাজনৈতিক বা কোন সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব দুদকের ওপর নেই।
আলমগীর স্বপন : তাহলে চাইলেই স্বাধীনভাবে কাজ করা যায় ?
ইকবাল মাহমুদ : অবশ্যই। করছিই তো,কেউ কিছু বলছে না। এটা অস্যত যে চাপ রয়েছে,এগুলো কিচ্ছু না।এগুলো হচ্ছে দায়িত্ব থেকে পলায়নপর মনোবৃত্তি।আর কাজ না করার জুজুর ভয়,হায় হায় কি হবে কি হবে ?
আলমগীর স্বপন : দায়িত্বের প্রথম বছর ব্যাংক খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনাদের নজর বেশি ছিলো ?
ইকবাল মাহমুদ : ব্যাংক খাত যথেষ্ট স্থিতিশীলতা এসেছে।ব্যবসায়ীদের জানাতে চাই,বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিপোর্টে বলেছে,ক্রেডিট গ্রোথ শতকরা ৬০ ভাগ হয়েছে। তাই এটা সত্য নয় দুদকের কারনে ঋন কমে গেছে।বরং দুদকের কারনে অনেক ক্ষেত্রে কু ঋন বন্ধ হয়েছে। জেনে খুশি হবেন, ব্যাংক গুলোর বোর্ড এখন খুব ভালোভাবে কাজ করছে।ব্যাংকাররাও খুব ভালোভাবে কাজ করছে। এটা আশার কথা।কারন ব্যাংকিং সিস্টেম যদি নষ্ট হয়ে যায়,ব্যবসা বাণিজ্য,মানুষের ক্রয় সক্ষমতা,চাকরী সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।সেটা আমরা বুঝি। আমরাও চাই ব্যাংক অবশ্যই লোন দিবে।আমরা এটাকে সাপোর্ট দিবো।কিন্তু ব্যাংক যাতে কু ঋনের মধ্যে না পরে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে,আপনারা দেখছেন।দুর্নীতিও কমছে-এটার প্রমাণ তো টিআই।টিআই এবার যে রিপোর্ট দিয়েছে সেই রিপোর্ট নিয়ে এবার কি কোন প্রশ্ন উঠেছে ? কেউ কি কোন কথা বলেছে ?
আলমগীর স্বপন : কিন্তু টিআই’র দুর্নীতির ধারনা সূচকে গড় স্কোর বা পাশ নম্বর ৪৩। বাংলাদেশ এবারও ২৬ পেয়েছে,অর্থাৎ ফেল করেছে ?
ইকবাল মাহমুদ : হ্যাঁ সেটা ঠিক আছে। পাশমার্ক আমরা পাইনি।শুধু আমরা না পাশমার্ক বহু দেশই পায়নি।দুর্নীতির এই করালগ্রাসটা শুধু আমাদের দেশকে খাচ্ছে তা না,বহু দেশকেই খাচ্ছে।উন্নয়ন যত হবে,দুর্নীতির মাত্রাও বাড়তে থাকে,এটার লাগাম ধরে টেনে রাখাটাই হলো দুর্নীতি দমনের কাজ। দুর্নীতি ও উন্নয়ন সামন্তরালভাবে এগোয়।এক্ষেত্রে উন্নয়নকে ছেড়ে দিয়ে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরবেন।কিন্তু দুটো ঘোড়াই একসাথে চলবে-এটাই থিউরি।
আলমগীর স্বপন : দুদক সেই ঘোড়ার পেছনে দৌড়াতে বা লাগাম টেনে ধরতে কতটা সক্ষম ?
ইকবাল মাহমুদ : আমরা দৌড়াতে পারছি।একটা সেন্স তো এসেছে যে, এটা করা ঠিক হবে না,এটা আইনের সমস্যা।দুর্নীতি দমন কমিশন যদি আবার ধরে,এমন ধারনা তো তৈরী হয়েছে,এটা তো সত্য।
আলমগীর স্বপন: সাধারণত সরকারি বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ থাকে। এসব প্রকল্পে যাতে জবাবদিহিতা থাকে এ জন্য সরকারকে দুদকের পক্ষ থেকে তদারকির প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো।কোন সাড়া পেলেন ?
ইকবাল মাহমুদ : এখনও কোন সাড়া আমরা পাইনি প্রস্তাবণা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে।আমরা বলেছি তারা যদি কোন সাপোর্ট চায় বা আমাদের কোন সহায়তা দরকার হয়-সেটার এখনও সাড়া পাইনি। তবে এনবিআর কিছু বিষয়ে সহায়তা চেয়েছে। কিছুদিন আগে এশিয়ান ইনফ্রাসট্রাকচার ব্যাংক এসেছিলো তারা তাদের প্রকল্পে আমাদের সহায়তা সম্ভবত চাইবে।তবে সরকারি বড় বড় প্রকল্পে রেসপন্স আছে।সরকার যে এ বিষয়ে আন্তরিক তা বোঝা যায় এই ভাবে যে,মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সবাইকে চিঠি দিয়েছে।লোক নিয়োগ,প্রকল্পের কেনাকাটায় প্রয়োজন হলে দুদকের সাহায্য নেয়ার জন্য।এখন তারা কি সাহায্য চাইবে এটা তাদের বিষয়-কিন্তু আমরা প্রস্তুত।
আলমগীর স্বপন : দুদকের পাচঁ বছরের কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারনী মতবিনিময়ে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেয়ার সুপারিশ এসেছিলো। এক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ আছে কি ?
ইকবাল মাহমুদ : চিন্তা আছে। কিন্তু এটা একটা জটিল বিষয়।এটা সিঙ্গেল আউট করলে কিন্তু বিপদ হয়ে যাবে, যদি শক্তভাবে না করেন। এক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসতে হবে।যে সকল পর্যায়ের মানুষের সম্পত্তির হিসাব কিভাবে দিবে,কি প্রক্রিয়ায় দিবে এবং সেই হিসাব কি করবেন আপনি।আমার একটা অভিজ্ঞতা আছে,সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে, সবাই জমা দিয়েছে,কিন্তু এরপর কি হবে ? ভারতের মতো দেশও কিছু করতে পারে নাই। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কি হবে। তাই তারা ট্যাক্সের দিকে নজর দিয়েছে,আমরাও ট্যাক্সের দিকে নজর দিয়েছি।কারন এটি একটি বিশাল বিষয়।সরকারি কর্মচারী ১২ লাখ কিন্তু,ব্যবসায়ী কত লাখ ?
আলমগীর স্বপন : যেহেতেু সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসে বেশি ভুক্তভোগী,সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি হলে সাধারণ মানুষের বেশি ক্ষতি হয়। তাই তাদের সম্পদ নিয়েই বেশি কথা হয় ?
ইকবাল মাহমুদ : শুধু সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী না বলে নাগরিকের কথা বলেন। দুর্নীতি শুধু সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী করছে না। যে কারনে আমি বলি যে দুর্নীতির সংজ্ঞাটাকে আগে সংজ্ঞায়িত করা দরকার।‘মিস ইউজ অব পাওয়ার ইন পাবলিক অফিসার্স’এই যে ডেফিনেশন এটা কতটুকু ভেলিড আই ডন্ট নো।
আলমগীর স্বপন : সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের কাউকে কাউকে ছাড় দেয়ার অভিযোগ আছে আপনার কমিশনের বিরুদ্ধে ?
ইকবাল মাহমুদ : না,কোন ছাড় কারোরই নেই। কয়েকদিন আগেও তো সরকারি কয়েকজন কর্মর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।একজন যুগ্মসচিবও ছিলেন এর মধ্যে। যুগ্ম সচিব তো প্রশাসন ক্যাডোরের নাকি ? আপনারা সত্য ঘটনা বলেন সেটা আমরা চাই।এখানে ক্যাডারের কোন প্রশ্ন নেই।এখানে প্রশ্ন হলো দুর্নীতি করেছেন কি করেননি।এখানে ক্যাডারের দিকে তাকিয়ে আমরা বসে নেই।
আলমগীর স্বপন: দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রমে রাজনৈতিক নেতাদের টুলস হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার কথা বলছিলেন।কিন্তু দুদকের ৫ বছর মেয়াদী কর্মপরিকল্পনার মতবিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের কিন্তু ডাকেননি ? কেন ?
ইকবাল মাহমুদ : আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচীতে মাননীয় মন্ত্রি-এমপিরা আসছেন।যখনই আমরা ডাকছি ওনারা আসছেন। নিশ্চয়ই ওনারা অঙ্গীকার নিয়েই আসছেন।প্রতন্ত্য অঞ্চলে যেমন রংপুরের মিঠাপুকুরে দুদকের কর্মসূচীতে একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।আমরা ধীরে ধীরে এগুচ্ছি।ওনারা আসছেন,দুর্নীতির ব্যাপারে ওনারা সোচ্চার হচ্ছেন।সংসদে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। ওনার বলছেন যে,সরকার এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সে।
আলমগীর স্বপন : এক্ষেত্রে দুর্নীতি বিরোধী সংসদীয় ককাস হতে পারে কি ? যেমনটি আমরা দেখছি আদিবাসী বিষয়ক ককাসের ক্ষেত্রে ?
ইকবাল মাহমুদ : মাননীয় স্পিকারের সাথে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
আলমগীর স্বপন : দুর্নীতি বিরোধী সচেতনতা তৈরী ও সরকারি সেবাখাতে জবাবদিহিতা আনতে দুদক গনশুনানী করছে।কিন্তু এতে কোন কোন সেবাখাতে ঘুষের রেট বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে ?
ইকবাল মাহমুদ : গনশুনানীতে আমাদের যে ত্রুটি ছিলো তা হলো আগে এতে ফলোআপ করা হতো না। আমরা এখন ফলোআপ করছি। রাজউকের গণশুনানীর ফালোআপ হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ কাজ হয়েছে। আমরা একটা স্টাডি করছি ইমপ্যাক্ট স্টাডি,সেটা দেখলে আমরা বুঝেবো কি হচ্ছে।
আলমগীর স্বপন : এছাড়া ২০টিরও বেশি সেবাখাতের দুর্নীতি অনিয়ম তদারকিতে টিম গঠন করেছেন।এর প্রভাব কতটা ? অতীতের অভিজ্ঞতা কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ভালো না ?
ইকবাল মাহমুদ : আমরা সফল হবো ইনশাল্লাহ।এটা ছোট্ট একটা বিষয় দুর্নীতির ক্ষেত্রে গুলো বের করা,ছিদ্র গুলো বের করা। আমরা রিভিউ মিটিং করেছি,ছিদ্রগুলো বন্ধ করার সিস্টেমিক যে ইমপ্রুভমেন্ট সেটা আমরা করবো।কারন আমাদের দুর্নীতি বিরোধী চোখ আছে,ওই ডিপার্টমেন্ট গুলোর তা নেই।যেহেতু আমরা দুর্নীতি নিয়ে কাজ করছি আমরা বুঝতে পারবো যে দুর্নীতির উৎসগুলো কি কি। উদাহরন হিসেবে বলা যায়,পেনশনের কথা। পেনশন নিয়ে অনেক কথা হয় এবং দুর্নীতিও হয়। একটা সিস্টেম যদি থাকে,সিস্টেমের গলদটা কোথায়,ঘুষটা কোথায় নেয়া হচ্ছে সেটা বের করার জন্য কাজ করছি আমরা। আমার স্থির বিশ্বাস এটা একটা ভালো ফল বয়ে আনবে।
আলমগীর স্বপন : এক্ষেত্রে দুর্নীতির তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে কি আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে নাকি শুধু সুপারিশমূলক রিপোর্টই দেয়া হবে ?
ইকবাল মাহমুদ : আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু মূল বিষয়টা হবে সিস্টেমিক ইমপ্রুভমেন্টের জন্য আমরা কেবিনেট ডিভিশনেক অনুরোধ করবো।
আলমগীর স্বপন : ফাদঁ পেতে ঘুষখোর ধরার অভিযানে চালাচ্ছে দুদক। এর প্রভাব কতটা ?
ইকবাল মাহমুদ : এটা খুব ভালো প্রভাব ফেলছে বলে আমরা মনে করছি।এখন ঘুষ নিতে বেশ সাবধান মানুষ। আগে হয়তো অফিসে টেবিলে বসেই ঘুষ নিতো,এখন সেটা নেয় না,যতটুকু জেনেছি অফিসে বসে ঘুষ নিয়ে অফিসকে আর অপবিত্র করতে চায় না বাইরে কোথায় কিছু করে। বাইরে কোথায় কি হচ্ছে তাও আমরা নজরদারিতে রাখছি, ফাদঁ পাতছি।
আলমগীর স্বপন : শুধু দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াই নয় এসব ক্ষেত্রে দুদকের জবাবদিহিতার প্রশ্নও আছে ?
ইকবাল মাহমুদ : আইনে একটা কমিটি করার কথা আছে। এখন সেই কমিটি আপনি করবেন কি করবেন না আমরা এখনও চিন্তা করিনি।তবে জবাবদিহিতার বিষয়টা পরিস্কার।আমরা একটা রিপোর্ট দেই।রিপোর্টটা পার্লামেন্টে যায়।পার্লামেন্টে ডিবেট হয়ে একটা গাইডলাইন হয়ে আসার কথা।
আলমগীর স্বপন : কিন্তু দুদকের রিপোর্ট নিয়ে পার্লামেন্টে ডিবেটের নজির বলতে গেলে নেই ?
ইকবাল মাহমুদ : আমরা আশা করি এটা নিয়ে ডিবেট হবে। আমরা চাই ডিবেট হোক।আমরা চাই সংসদ থেকে একটা গাইডলাইন আসুক যে আমরা কিভাবে কার্যক্রম চালাবো।আমরা চাই জবাবদিহিতার আওতায় আসতে, চাই সমালোচনা এবং সেটি যেন গঠনমূলক হয়।আমরা চাই যে আমাদের এখানে কি দুর্নীতি হয় সেটা নিয়ে আপনারা রিপোর্ট করেন।
আলমগীর স্বপন : দুর্নীতি প্রতিরোধে নতুন আর কি কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন ?
ইকবাল মাহমুদ : আমরা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন চেয়েছি। হাজতখানা তৈরী হচ্ছে। এছাড়া মানুষ যাতে সহজে অভিযোগ জানাতে পারে এজন্য হটলাইন হচ্ছে।১০৬ নম্বরে ফোন করে ভুক্তভোগীরা বিনা খরচে তাদের অভিযোগ আর সমস্যার কথা দুদককে জানাতে পারবেন। এরইমধ্যে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং এর মাধ্যমে ৮`শ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বেস্ট প্রাকটিসের জন্য।
আলমগীর স্বপন : এসব ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা কতটা পাচ্ছেন ?
ইকবাল মাহমুদ : শতভাগ সহযোগিতা পাচ্ছি। আমার বিশ্বাস আগামী দিনেও সরকার কমিশনকে সাপোর্ট দিবে।
আলমগীর স্বপন : ধন্যবাদ আপনাকে।
ইকবাল মাহমুদ : আপনাকেও ধন্যবাদ ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি আলমগীর স্বপন।