সোমবার ২৪ জুন, ২০১৯
deutschenews24.de
Ajker Deal

উত্তর প্রদেশ : নির্বাচন ও কয়েকজন নারীর গল্প

আলতাফ পারভেজ
প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বুধবার, ১২:৩১  পিএম

উত্তর প্রদেশ : নির্বাচন ও কয়েকজন নারীর গল্প

সাধনা গুপ্ত, মুলায়েম সিংহ যাদবের স্ত্রী


বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ রয়েছে ভারতে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগই দরিদ্র। আর ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ রয়েছে উত্তর প্রদেশে। সেই উত্তর প্রদেশে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হবে আগামী দু’ সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু দারিদ্র্য বা অর্থনৈতিক বঞ্চনা সেখানে এখনও নির্বাচনী রাজনীতির প্রধান ইস্যু নয়। বরং শাসক এলিটদের পারিবারিক বিবাদই নির্বাচনী রাজনীতিতে দীর্ঘ ছায়া বিস্তার করে আছে।


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে গঙ্গা-যমুনা বিধৌত উত্তর প্রদেশ এক পুরানো ভরকেন্দ্র। ২০ কোটি জনসংখ্যার এই ভারতীয় প্রদেশে লোকসভার আসন রয়েছে ৮০টি। অংকের সেই হিসাবে ভারতীয় রাজনীতিতে এই রাজ্যের গুরুত্ব ১৫ ভাগ হলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি। উত্তর প্রদেশ যার দখলে থাকে দিল্লি পর্যন্ত তার দীর্ঘ ছায়া পড়েÑ এটাই প্রচলিত কথা।


আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এই প্রদেশে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হবে কয়েক ধাপে। এই নির্বাচনে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের গতানুগতিক শক্তি পরীক্ষার পাশাপাশি ভাগ্য পরীক্ষা হচ্ছে কয়েকজন হাইপ্রোপাইল নারী ব্যক্তিত্বের; যাদের মধ্যে আছেন কংগ্রেসের প্রিয়াংকা গান্ধী ও বিএসপি’র মায়াবতী। সোনিয়া ও রাহুলের ক্যারিশমা কমে যাওয়ায়Ñকংগ্রেস এবার প্রিয়াংকাকে নির্বাচনী মাঠে ব্যবহার করতে চাইছেÑ অলৌকিক কোন প্রত্যাশায়। আর সমকালীন ভারতের সবচেয়ে আলোচিত দলিত নেত্রী মায়াবতীর দল বহুজন সমাজবাদী পার্টি ১০ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে। ফলে এই নির্বাচনে পরাজিত হলে মায়াবতী ও তার দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যত শেষ হয়ে যেতে পারে।


তবে মায়াবতী ও প্রিয়াংকাকে ছাড়িয়ে এই নির্বাচনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে উঠেছেন বস্তুত রাজনীতির বাইরের আরেক নারী সাধনা যাদব। উত্তর প্রদেশকেন্দ্রিক নির্বাচনী খবরাখবরে তৃতীয় এই নারীর উত্থান মূলত সমাজবাদী পার্টির মুখ্য দুই নেতা পিতা মুলায়েম সিং যাদব এবং তাঁর পুত্র মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের হঠাৎ সৃষ্ট বিবাদকে উপলক্ষ্য করে।


উত্তর প্রদেশের সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব হলেন মুলায়েম সিং যাদবের প্রথম স্ত্রী মালতি দেবি’র সন্তান। ২০০৩ সালে অখিলেশের মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পরই গুঞ্জন শোনা যেতে থাকে যে, মুলায়েমের একজন দ্বিতীয় স্ত্রী আছেন। ২০০৭ সালে আয়কর সংক্রান্ত এক মামলার হলফনামা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, সাধনা গুপ্ত নামে প্রকৃতই মুলায়েমের একজন স্ত্রী রয়েছেন। প্রতীক যাদব নামে যার এক পুত্রও রয়েছে এবং সেই প্রতীক যাদবের স্ত্রী হলো অপর্ণা যাদব। একটিভিস্ট হিসেবে যার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।


তবে মুলায়েমের জীবনের সাধনা গুপ্ত অধ্যায় সাধারণ রাজনৈতিক পরিমন্ডলে ২০০৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত অজানাই ছিল। কারণ মালতী দেবী জীবিত থাকা অবস্থায় অখিলেশদের লখনৌর বাড়িতে ঠাঁই হয়নি সাধনার।


কিন্তু ২০০৩-এর পর থেকে এসব তথ্য যত প্রকাশিত হতে থাকে ততই ভারতের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাদব পরিবারে অন্ত:কলহের খবরাখবরও অল্পবিস্তর জানাজানি হতে থাকে। সর্বশেষ, গত কয়েক মাস পূর্বে, রাজ্যে নির্বাচনী তোড়জোড় শুরু হওয়া মাত্র মুলায়েম-অখিলেশ পরিবারের এই বিবাদ রাজনীতির বিস্ফোরক উপাদানে পরিণত হয়। পিতা-পুত্রের সেই দ্বন্দ্ব পিতার পরাজয়ের মধ্যদিয়ে আপাতত থিতু হয়েছে।


কিন্তু নির্বাচনী ইস্যুর চেয়েও এই ঘটনার পেছনের কাহিনী এখনও উত্তর প্রদেশের গ্রাম-গঞ্জে মেঠো আড্ডায় মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।


কী সেই কাহিনী?


উত্তর প্রদেশে ২০১২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির বিজয়ের পর মুখ্যনেতা অখিলেশের স্ত্রী ডিম্পল যাদব পুত্র অখিলেশকে যখনি মুখ্যমন্ত্রী করার উদ্যোগ নেন তখনি অখিলেশের সৎ মা সাধনা তার বিরোধিতা করেছিলেন যদিও মুলায়েমকে থামাতে ব্যর্থ হন। সেই ক্ষোভ থেকেই এবার নির্বাচনী তোড়জোড় শুরু হওয়া মাত্র তিনি পুরানো লক্ষ্যে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং সমাজবাদী পার্টির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতাকেও তার পাশে জড়ো করে ফেলেন। অধিকন্তু মুলায়েমও এবার তার প্রস্তাবে সম্মত ছিলেন।


পারিবারিক এই বিবাদে ধীরে ধীরে আরও দুই নারীও শামিল হন। তাদের একজন হলেন অখিলেশের স্ত্রী ডিম্পল যাদব এবং তার সৎ ভাই প্রতীকের স্ত্রী অপর্ণা যাদব।


বলা বাহুল্য, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির প্রথাগত বৈশিষ্ট্য মতোই ডিম্পল ও অপর্ণারও পারিবারিক প্রভাবকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার অভিলাষ আছে এবং সেটা বেশ তীব্র। যার পরিণতিতে ৩৯ বছর বয়সী ডিম্পল ইতোমধ্যে লোকসভার সদস্য হয়েছেন একটি নিরাপদ আসন থেকে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অখিলেশ সেই ‘ব্যবস্থা’ করে দিয়েছেন। কিন্তু অপর্ণা অনুরূপ সুযোগ না পেয়ে ক্ষুব্দ ছিলেন। অপর্ণার ক্ষোভে ক্ষুব্দ হন শাশুড়ি সাধনা গুপ্তও। অপর্ণা ও প্রতীকের মা সাধনা মনে করেন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে অপর্ণাকেই সমাজবাদী পার্টির সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা উচিত ছিল।

কৌতুহলউদ্দীপক দিক হলো, শশুর মুলায়মেরও এরূপ পক্ষপাত ছিল। এই ছোটবউ তার বিশেষ প্রিয়পাত্র। এবারের নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে লখনৌ ক্যান্টমেন্ট আসন থেকে। যেখানে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে জিতে আসা বেশ কঠিনই হবে। যদিও দারুণ রূপসী অপর্নার প্রতি জনতার আগ্রহও তুমুল। ইতোমধ্যে অপর্না বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন গরু জবাই বিরোধী অবস্থান নিয়ে। ২০১৫ তে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সেলফি তুলে একদফা তুমুল বিতর্কেরও জন্ম দেন তিনি। এসব নিয়ে অপর্ণার বিরোধী বাধে অখিলেশের সঙ্গেও। আর এসব বিরোধে জড়ান অখিলেশের সৎ মা সাধনাও। উত্তাপের আঁচ লাগে তা মুলায়েমের গায়েও। ইতোমধ্যে মুলায়েমের ভাই শিবপাল যাদব সাধনা-প্রতীক-অপর্ণা ত্রয়ীর পক্ষ নেন। পারিবারিক বিরোধ এভাবেই পূর্ণতা পায়।


কিন্তু শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি অখিলেশের দিকেই হেলে আছে। দলটির নির্বাচনী প্রতীক ‘বাইসাইকেল’ তিনিই বরাদ্দ পেয়েছেন। আবার রাজনৈতিক জোট করে রাহুল গান্ধীও যেয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর। প্রিয়াংকা গান্ধী নেমেছেন এই দুই তরুণকে বাঁচাতে। পৈত্রিক বাড়ি উত্তর প্রদেশে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা গান্ধী পরিবারের জন্যও জীবন-মরণ প্রশ্ন। কারণ গত নির্বাচনে তারা ৪০৮ আসনের মধ্যে মাত্র ২৮ আসন পেয়েছিল।


এদিকে, আপতত মুলায়েম পুত্রের কাছে হার মানলেও যাদব পরিবারে তুষের আগুণ জ্বলছেই। মুলায়েমের বয়স এখন ৭৭ আর অখিলেশের ৪৩। ৩৪ বছরের এই যে ব্যবধান তা অখিলেশের জন্য প্লাস পয়েন্ট হলেও সাধনা-অপর্ণা-প্রতীক-শিবপাল মিলে নতুন কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিলে যাদব জনগোষ্ঠী কী মনোভাব দেখাবে তা এখনি নিশ্চিত করে বলা যায় না। সেক্ষেত্রে আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে আগামীতে পারিবারিক এই বিবাদের আগুন কিরূপ লেলিহান রূপ নেবে।


তবে এই বিবাদের ফল যাই হোক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর এইরূপ নির্বাচনী সংস্কৃতির মূল স্ববিরোধিতা খুব শিগগির পাল্টাবে না বলেই মনে হচ্ছে যেখানে, ডাইনেস্টিরূপ স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারগুলো থেকেই দরিদ্র মানুষরা উৎসাহের সঙ্গে তাদের তথাকতিথ ‘প্রতিনিধি’ বাছাই করেন যারা নির্বাচনের পর ওই ভোটারদের ভাগ্য পরিবর্তনে যুগের পর যুগ সামান্যই অবদান রেখেছেন বা রাখবেন।
--
আলতাফ পারভেজ : সাংবাদিক ও গবেষক