সোমবার ২৪ জুন, ২০১৯
deutschenews24.de
Ajker Deal

মার্কিনের তাইওয়ান কার্ড: উত্তপ্ত চীন

হাসান তারিক চৌধুরী
প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার, ০৭:৩৬  এএম

মার্কিনের তাইওয়ান কার্ড: উত্তপ্ত চীন

চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা কোনদিনই থেমে ছিলোনা। বরং প্রতিদিনই মার্কিনিদের এসব তৎপরতার তীব্রতা বেড়ে চলেছে। যার ফলে অশান্ত হয়ে উঠছে এশিয়া এবং এ অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রসমূহ। নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য চিরস্থায়ী করার জন্য পুরো এশিয়া জুড়ে মার্কিন প্রশাসন এক প্রভাবলয় সৃস্টি করেছে। চীনের বিরুদ্ধে এখন সে প্রভাব বলয়কেই কাজে লাগাচ্ছে পেন্টাগন। তাদের এই নীতিহীণ কৌশলে এখন ব্যাবহার করা হচ্ছে একসময়ের এশিয়ার চার উদীয়মান বাঘের একটি বলে কথিত তাইওয়ানকে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, এ নোংরা কাজটি তারা গোপনে নয়। বরং বেশ ঘটা করেই করছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর গত ১৩ ডিসেম্বরের তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাইওয়ানকে অস্ত্রসজ্জিত করতে চায়। মার্কিনের উপ সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিঃ আব্রাহাম ডেনমার্কের বরাত দিয়ে রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে আরো বলেছে, এখনো পর্যন্ত ওবামা প্রশাসন ‘এক চীন নীতি’ অনুসরন করে চলছে। তবে আগামী ২০ জানুয়ারী নয়া মার্কিন রাষ্ট্রপতি মিঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব হাতে নিলে চীনের বিষয়ে মার্কিনের পরবর্তী ভূমিকা কি হবে সেটি এখন বলা যাচ্ছে না। সুতরাং মার্কিন উপ সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট করেই বুঝা যায়, আগামীদিনে চীনের ব্যাপারে মার্কিনের ভুমিকা মন্দ ছাড়া আর কিছু হবে না। এজন্যই তারা নতুন করে প্রবলভাবে তাইওয়ানকে অস্ত্রসজ্জিত করতে চাইছে। একারনেই এতো বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘এক চীন নীতি’র ন্যায্যতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, চীনের সাথে ব্যাবসা না করলে এ নীতি মানতে হবে কেন? গত ২ ডিসেম্বর সমস্ত কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করে তাইওয়ানের রাষ্ট্রপতি মিস সাই ইং ওয়েনের সাথে ফোনালাপ করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছেন। জাতিসংঘে গৃহিত ২৭৫৮ প্রস্তাব অনুযায়ী ‘এক চীন নীতি’কেই এর সব সদস্যরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর ভেতরে রয়েছে। সে অনুযায়ী তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে, চীনকে ডিঙ্গিয়ে অন্য কোন রাষ্ট্রপ্রধান তাইওয়ানের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলাপ সংলাপ চালাতে পারেন না। অথচ, ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম কোন মার্কিন রাষ্ট্রপতি এভাবে তাইওয়ানের সরকার প্রধানের সঙ্গে কথা বলে এরকম নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করলো। একাজটি মার্কিনের পক্ষ থেকে চীনের বিরুদ্ধে শুধু নেতিবাচক তৎপরতা হিসেবেই বিবেচিত হয় নি। বরং এক ধরণের সামরিক উস্কানি বলেই বিবেচিত হতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন থেকেই প্রধানতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে আসছে। মার্কিন উপ সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী আব্রাহাম ওয়াশিংটনে ‘প্রজেক্ট ২০৪৯ ফোরামের’ এক সভায় সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, ২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। এ বিক্রির পরিমাণ ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। কিন্তু এ অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ কত হবে এবং কখন সেটি সম্পন্ন হবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেন নি। তবে মিঃ আব্রাহাম স্পষ্ট করেই বলেছেন, মার্কিনের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘তাইওয়ান রিলেশন অ্যাক্ট’ এর বলেই যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পাশে থাকবে।অর্থাৎ প্রয়োজনে তাইওয়ানে মার্কিনের সামরিক উপস্থিতিও হতে পারে। অন্যদিকে, ‘এক চীন নীতি’র লংঘন চীনের জন্য বেশ স্পর্শকাতর। বিষয়টি মার্কিনের সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও জড়িত। নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আজকের দুনিয়ার অন্যতম পারমাণবিক শক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগামী দেশ চীন নীরব বসে থাকবে না। ফলে দেখা যাচ্ছে, তাইওয়ান কার্ডটি ব্যাবহার করে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পথেই হাঁটছে ট্রাম্পের প্রশাসন। তাহলে কি মার্কিনের সঙ্গে চীনের সামরিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়েছে? এরকম প্রশ্নই এখন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা তো গত ১৪ জানুয়ারী খোলামেলাভাবেই লিখেছে যে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে চীন-মার্কিন যুদ্ধের কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? আলোচ্য দুটো দেশই পারমাণবিক শক্তিধর এবং বিরাট অর্থবলের অধিকারী। খুব স্বাভাবিকভাবেই এ দুটো দেশের মধ্যকার যুদ্ধ শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে তাদের উভয়েরই প্রভাব বলয়ভুক্ত দেশগুলোর মাঝে। সঙ্গত কারনেই এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হবে দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলো। এরপর এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো। তারপর একে একে অন্যান্য দেশ। এভাবেই জন্ম হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার। আমরা কি সেটি টের পাচ্ছি? নাকি বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের তামাশা হিসেবে এটিকে উপভোগ করছি। দেখাই যাচ্ছে, চীনকে টার্গেট করে ভয়ানক এক যুদ্ধের পটভূমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে চীনকে এবং বিশ্ব বানিজ্য ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের বিস্ময়কর সাফল্যকে পশ্চিমা দুনিয়া এক ভয়ানক হুমকি হিসেবে প্রচার করার চেস্টা চালাচ্ছে। কটাক্ষ করা হচ্ছে, এশিয়ান অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ব্যাংক(এআইআইবি) এবং ব্রিক্‌স এর মতো আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রচেষ্টাকে। পদ্মাসেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সৃষ্ট জটিলতার সময়ে বাংলাদেশের জন্য চীনের সহযোগিতার হাত বাড়ানো তখন পশ্চিমের গাত্রদাহের কারণ হয়েছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের এক ডানপন্থী লেখক এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের চীন বিষয়ক পরামর্শদাতা মিঃ পিটার নাভাররো চীনের উত্থানকে ভয়ঙ্কর হিসেবে চিত্রিত করে বেশ কিছু পুস্তকও রচনা করেছেন। সেসব পুস্তক দেশে দেশে নানা প্রভাবশালী মহলে বিলিও করা হচ্ছে। মিঃ পিটার তার সেসব পুস্তকে রাষ্ট্রপতি মার্কিন প্রশাসনকে তাইওয়ানের সাথে আরো বেশী করে জড়িয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এভাবেই আজ মার্কিনের তাইওয়ান চক্রান্তের বিষ চীন এবং পুরো দুনিয়াকে বিষাক্ত করে তুলেছে। চীনের সাথে মার্কিনের সম্ভাব্য সংঘাত প্রসঙ্গে এখন সারা দুনিয়ায় দুটো মত রয়েছে। এক অংশ মনে করেন এ দুটো দেশ একে অপরকে পেশী প্রদর্শনই করবে। কখনোই যুদ্ধে লিপ্ত হবে না। কারণ, এরা বানিজ্যিকভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া পুরোনো ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব তো রয়েছেই। অপর অংশ মনে করেন, এ যুদ্ধ হবে। কারণ, চীনের বিরাট উত্থান বিশ্ববাজারে মার্কিনকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে। মার্কিন রাজনীতি যে কোন মূল্যে বিশ্ববাজারে তার সর্বোচ্চ কতৃত্ব চায়। এক্ষেত্রে চীন তার বড় প্রতিদ্বন্দি। তাই বাজার দখলের প্রয়োজনে এ যুদ্ধ অবধারিত। শেষোক্ত মতটির প্রায় কাছাকাছি মত দিয়েছেন, বিশিষ্ট গবেষক, লন্ডন স্কুল অব ইকমিক্স এর অধ্যাপক ক্রিস্টোফার কুক। তিনি তার ‘ দি ইম্পোরেবল ওয়ারঃ চায়না’ বইতে লিখেছেন, ‘নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা থাকলে দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হবে না। এমনটা সব সময় নাও হতে পারে’। সত্যিই, ইতিহাস সাক্ষী দেয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ও বেশকিছু দেশের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ছিলো। তার পরও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র তার প্রকৃষ্ট উদাহরন। যে পরিপ্রেক্ষিত তখন ছিলো আজ নবায়িত আকারে সে পরিপ্রেক্ষিতই আমরা দেখছি। তখন জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ তথা উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বানিজ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষনবাদ জন্ম হয়েছিলো। সে পরিপ্রেক্ষিতই দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের জন্ম দিয়েছেলো। আজ মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অভিবাসন বিরোধী নীতির কথা বলছেন, যেভাবে অতি সংরক্ষনবাদী বানিজ্যের শ্লোগান দিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তুলে এগুতে চাইছেন। সে নীতি যুদ্ধ ছাড়া আর কি জন্ম দিতে পারে? সে নীতির কারনেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের অধিনায়ক এডমিরাল হ্যারী হ্যারিস গত ১৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনে সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত রয়েছে। এরকম ঘটনার কারনেই চীনের ভেতরে উত্তেজনা বাড়ছে। গত ১২ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন পোষ্ট পত্রিকা লিখেছে, ‘এক চীন নীতি’কে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প চীনের সঙ্গে যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছেন’। এরই মাঝে গত ১৪ ডিসেম্বর তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সংলাপের আয়োজক ছিলো, যৌথভাবে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়, নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি এবং জাপান ইন্সটিটিউট অফ পলিসি স্টাডিজ। এ সংলাপের আলোচ্য বিষয় ছিলো, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা জোরদার এবং নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রভৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের এসব কূটনৈতিক তৎপরতা চীনকেও সক্রিয় করে তুলেছে। যার ফলে গত ১২ জানুয়ারী চীনা কতৃপক্ষ মার্কিনের প্রতি করা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। মার্কিন রাজনীতির হিসেবমতে তাইওয়ানকে আপাতঃ চীনের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এ হাতিয়ার নয়া মার্কিন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে যেকোন মুহুর্তে ফস্‌কে যেতে পারে।  

[হাসান তারিক চৌধুরীঃ সম্পাদক, বিশ্ব গনতান্ত্রিক আইনজীবি পরিষদ। ইমেইলঃ htarique@gmail.com]