বৃহস্পতিবার ২৭ জুলাই, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

দুঃসাহসী এক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথা

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬ শনিবার, ০২:০৭  এএম

দুঃসাহসী এক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথা

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৫ (ডয়েচেনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটডিই) -- বাস্তব সত্য কখনো কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেনের বীরত্বের স্মৃতি কথা তেমনি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। নওগাঁ জেলা সদর থেকে ৫৬ কিলোমিটার উত্তরে ভারতের কোল ঘেঁষে ধামইরহাট উপজেলার অবস্থান। উমার ইউনিয়নের কাশিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষকের সন্তান আফজাল হোসেন। তিনি এখন ধামইরহাট উপজেলা পৌর শহরের দক্ষিন চকযদু টিএন্ডটি মহল্লার বাসিন্দা। একাত্তরের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া লাখো মুক্তি সেনাদের তিনি একজন। ৭১-এর উত্তাল মার্চের কথা।

ঢাকা শহরের মতো সারা দেশেই পাক সেনাদের চলছে তাণ্ডব। নওগাঁর সীমান্ত ঘেঁষা উপজেলা ধামইরহাট তখন এমনই এক তাণ্ডবময় এলাকা। এলাকার মানুষগুলোর অধিকাংশই তখন সীমান্ত পেড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। সদ্য পাশ করা গ্রাজুয়েট আফজাল হোসেন দাঁড়িয়ে দেখছেন সে দৃশ্য। মনে ভাবনা, সীমান্তের ওপাড়ে যদি যেতেই হয়, তবে ফিরে আসব ট্রেনিং নিয়ে, রুখব পাক সেনাদের। কিন্তু ভাবনাটা বাস্তবে রূপ পাবার আগেই ছোট্ট বাজারটাতে হানা দেয় পাকিস্তানী বাহিনী। উপায়ন্তর না দেখে বাড়ি থেকে সাত কিলোমিটার দুরে আত্রাই নদীতে লুকিয়ে কাটান সারা দিন। তারপর কাউকে না জানিয়েই যুদ্ধযাত্রা।
১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে পিতা-মাতাকে না বলেই বাঙ্গালিপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগ দেন। তার একদিন পরেই সেখানে যোগ দেন আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ক্যাম্পে পরিচয় হয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ, জয়নাল আবেদীন, আব্দুল কুদ্দুছ, বদিউজ্জামান, শফিউল, ইদ্রিস আলীসহ অনেকের সঙ্গেই। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবুল আজাদ। এক মাসের ট্রেনিং দেওয়ার পর একশজনের একটি দলকে আর্মি ভ্যানে জলপাইগুড়ি অর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং সেখানে মেজর রেড্ডীর অধীনে ট্রেনিং করেন। জলপাইগুড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে ১৫ দিন পর সবাইকে বিমানে করে দর্জিলিং বিমান ঘাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়এবং পরের দিন উত্তর প্রদেশের টান্ডুয়া দেরাদুন নামক স্থানে এক মাস ট্রেনিং হয় মেজর মালহোত্রা ও মেজর চোয়ানের অধীনে। ট্রেনিং শেষে জলপাইগুড়ি ফিরে এসে সবাইকে একটি করে রাইফেল দেওয়া হয় যুদ্ধের জন্য।
তার দুঃসাহসী অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে আবারও তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। ফিরে যান সেই অগ্নিঝরা দিনে। একের পর এক বলে যান অগ্নিঝরা দিনের স্মৃতির গৌরবময় অধ্যায়। যা আজো তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় একাত্তুরের রনাঙ্গনে। ট্রেনিং শেষে আফজাল হোসেন, আব্দুর রউফ, জয়নাল আবেদীন, আব্দুল কুদ্দুছ, বদিউজ্জামান, শফিউল, ইদ্রিস আলীসহ অন্তত ৫০ জনের মত মুক্তিযোদ্ধাদের ধামইরহাট এলাকার কালুপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে গেরিলা যুদ্ধের জন্য পাঠানো হয় এবং বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।নওগাঁর ধামইরহাট, রাঙ্গামাটি, র্ফাশিপাড়া, হিলি, চৌঘাট ডাঙ্গি এলাকার পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১০ ডিসেম্বর চৌঘাট ডাঙ্গী নামক স্থানে যুদ্ধের জন্য অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৪ ডিসেম্বর ভোরে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আত্রাই নদী অতিক্রম করার পর উত্তর দিক থেকে একটু একটু করে শত্রুর অবস্থানের দিকে এগোতে থাকেন। এমন সময় তাঁর মাথার উপর দিয়ে গুলি হচ্ছিল ঠিক তখন তিনি লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ার সময় বাম হাতটি ভাঙ্গে যায় এবং বাম পায়ের হাঁটুর নিচে সামান্য গুলির ছটা লাগে। এখন সেই হাতটি ভালো হলেও আজও বাঁকা হয়েই আছে এবং পায়ের গুলির দাগটি এখনও সেই দিনের চিহ্ন বহন করে। এভাবে এগোতে থাকার সময় জয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত ওই সময় সামনা সামনি যুদ্ধে শত্রুর একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার সহযোদ্ধা বন্ধু লোকমানের দেহে। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন লোকমান। একই সময় কয়েকজন পাকিস্থানি সৈনিকও মারা যায়। এর অল্প কিছু দিন পর তারা দেশ স্বাধীনের আভাস শুনতে পান। তখন ছিল ১৪ ডিসেম্বর। দু´দিন পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের কথা জানতে পারেন তিনি। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেওয়া হয়নি কোনও খেতাব। ধামইরহাটে পাক বাহিনীর দুর্গে আঘাত হানার পেছনে অবিস্মরনীয় ভুমিকা রেখেছেন এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা।
এই অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধার জন্ম ১৯৪৬ সালে নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার চকযদু (কাশিয়াডাঙ্গা) গ্রামে। পিতা ফারাজ উদ্দিন মন্ডল। আফজাল হোসেন নওগাঁর করনেশান হাই স্কুল (বর্তমানে নওগাঁ জেলা হাই স্কুল ) থেকে ১৯৬৩ সালে এস. এস. সি, নওগাঁর বি এম সি মহিলা কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে আই.এস.সি এবং নওগাঁ ডিগ্রী কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বি. এস সি পাশ করেন। কিন্তু এলাকার মানুষের সেবা করার কথা চিন্তা করে তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষকতা করা অবস্থায়ই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার রউফের অধীনে যুদ্ধ করেন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বিজয় সুনিশ্চিত করেই তিনি ফিরেন পরিবারের কাছে।
তিনি বর্তমানে নিজ বাড়িতে এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বসবাস করছেন। আর অবসর সময়ে গল্প শোনান ৭১-এ ফেলে আসা সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর।

ডয়েচেনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটডিই/এমআরএফ