মঙ্গলবার ২৪ অক্টোবর, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

৭১এর গণহত্যার নির্মম দৃষ্টান্ত শরীয়তপুরের মধ্যপাড়া বধ্যভূমি

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬ শনিবার, ০২:০৪  এএম

৭১এর গণহত্যার নির্মম দৃষ্টান্ত শরীয়তপুরের মধ্যপাড়া বধ্যভূমি

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৫ (ডয়েচেনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটডিই) --১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরীয়তপুর পৌর এলাকার কাশাভোগ, নিলকান্দি,মধ্যপাড়া, ধানুকা, রুদ্রকরসহ হিন্দু প্রধান এলাকা গুলোতে রাজাকারদের সহায়তায় ৬ থেকে ৭ দফায় শত শত পাক সেনারা হানা দিয়ে অকাতরে পাখির মত গুলিকরে হত্যা করে প্রায় নয়শত নারী-পুরুষ শিশুসহ আবাল বৃদ্ধ বনিতাকে। ৭১ সালের ২২ মে হত্যা করা হয় ৩ শত ৭০ জনকে। ধর্ষন করা হয় শতাধিক যুবতীকে। চোখ বেঁধে নিয়ে মাদারীপুর এ, আর হাওলাদার জুট মিলসে অবস্থিত আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় ৭০ জন যুবতী নারীসহ দু’শতাধিক পুরুষকে। তারা কেউ আজও ফিরে আসেনি। ৪২ বছর যাবৎ স্বামী গৌরাঙ্গ চন্দ্র ফিরে আসার পথ চেয়ে ৬৫ বছরের বৃদ্ধা যুগল বালা ২০১১ সালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেছেন কমরেড নুরুল ইসলাম, আবুল কালাম হাওলাদার, দীনেশ চন্দ্র সাহা, স্বপন সাহা, সোহরাব শিকদার, সুভাষ দাস, মহাদেব দাস, সনাতন দাস, মানিক দাস, মিনা রানী পোদ্দার ও কালু সাহা সহ ৩০/৪০ জন প্রত্যক্ষদর্শী। যারা সে সময়ের সেই বিভিষিকাময় হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী।
তারা জানান, ৭১ এর ২২ মে দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হতে চলেছে, পাক হানাদার বাহিনীর জাহাজ সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া নদীর ঘাটে নোঙ্গর করে। এরপর দেড় শতাধিক সেনা সদস্যকে রাজাকার সোলেমান মৌলভী, রবিউল্লা মাষ্টার, আজিজ মোল্যা, মজিবর তালুকদার, নুরুল আলম তালুকদার, মতিন খানসহ রাজাকারের একটি বিশাল দল আঙ্গারিয়া বাজারের উপর দিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা মনোহর বাজার ও রুদ্রকরের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। পাকবাহিনী আসতে দেখে কমরেড নুরুল ইসলাম (বর্তমানে আঙ্গারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দপ্তরী) হাতে লাল গামছা উড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে বলছিল ”পাক সেনারা ঢুকে পড়েছে, যে যেখানে আছ পালাও, পালও ,জীবন বাচাও। এভাবে তিনি রুদ্রকর পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার দৌড়ে মানুষের কাছে সংবাদ পৌছে দিয়ে অনেককে নিরাপদে আশ্রয় নিতে সাহায্য করেছিল।
ঐ সময় পাক বাহিনী আঙ্গারিয়া বাজার অতিক্রম করে কাশাভোগ তালুকদার বাড়ী ব্রীজের নিকট পৌঁছলে গরু নিয়ে বাড়ী যাওয়ার সময় কৃষক আঃ সামাদ শিকদার ভয়ে দৌড় পালাতে চাইলে পাক সেনারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। ঘটনাস্থলেই প্রথম শহীদ হন আঃ সামাদ শিকদার। এর থেকে সামান্য দুরে সম্ভু কর্মকারকে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ১০০ গজ পূর্বদিকে নাগ বাড়ীতে ঢুকে ৮৫ বছরের বৃদ্ধ উপেন্দ্রনাথ নাগকে গুলি করে হত্যা করে। গুলীর শব্দ শুনে তার স্ত্রী তাবিনী বেলা নাগ (৭৫) চিৎকার দিলে তাকেও গুলী করে হত্যা করা হয়। পাশের বাড়ীতে পালিয়ে থাকা একই পরিবারের শিবু দাস সাহা ও তার ভাই গৌরাঙ্গ সাহা, শিবু দাসের ৩ ছেলে সহ একজন মহিলাকে নির্মমভাবে গুলি করে ও পরে ব্যানট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। টানা হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে কাশাভোগ গ্রামে।
পাক সেনারা রাজাকারদের সহায়তায় মধ্যপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে এলোপাথারী গুলিছুড়ে। গুলীর শব্দ ও মানুষের আহাজারি শুনে এই গ্রামের মানুষেরা জীবন বাঁচানোর জন্য দিগবেদিক দৌড়াতে শুরু করে। রাজারকারদের নেতৃত্বে পাক সেনারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে এলাকায় ঢুকে পাখির মত গুলি করে মারতে শুরু করে দেয়। এসময় ৮ মাসের শিশু পুত্র কৃষ্ণকে নিয়ে একটি মাটির গর্তের ভিতর পালিয়ে থাকা তার মা রাধা রানীকে গুলি করে। রাধারানী গুলি খেয়ে ঘটনাস্থালেই মারা যায়। পরের দিন সকালে গর্তের ভিতর দখা যায় রাধা রানীর ৮ মাসের শিশু পুত্রটি মাতৃদুগ্ধ পান করা অবস্থায় মায়ের লাশের পাশে মরে পড়ে আছে। এরপর রাধা রানীর স্বামী হরি সাহা (৫০) ও তার মা চিরবালা (৮০) কে ও হত্যা করা হয়। পাক সেনাদের একটি দল সাথী বিড়ি ফ্যাক্টরীর মালিক ভজনিতাই সাহার বাড়িতে ঢুকে রমনী সাহা ও তার মেয়ে শোভা রানী ও তার শ্বশুর বাড়ী থেকে আশ্রয় নিতে আসা ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে।
ঘাতকের একটি দল দাসপাড়া ঢুকে মন্টু দাসের যুবতী বোন সখী বালা দাসকে তাড়া করলে সে তার দাদা, বৌদি ও তাদের ৬ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলে ঘাতকরা জানালা দিয়ে গুলি করলে সখী বালার বুকে গুলিবিদ্ধ হয়। দাদা, বউদি ও শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য সখী বালা গুলি খেয়েও চিৎকার করেনি। মন্টু দাস তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে পিছনের বেড়া ভেঙ্গে পালিয়ে যেতে পারলেও সখী বালা সেখানেই ঘরের ভিতর নিস্তেজ নিথর দেহ নিয়ে পড়ে থাকে। ঐ সময় রাজাকাররা ঐ ঘরটিতে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে সখী বালাকে সহ ঘরটিকে পুড়ে ভষ্ম করে দেয়। আর এ দৃশ্য দেখে রাজাকাররা বিকৃত আনন্দ উল্লাস করে।
মানিক দাস জানান, মিলিটারির দল ৬ দফায় এই এলাকায় হামলা চালায়। যুগলবালাদের বাড়ীতে থাকা ২টি দালান ঘরের একটি মর্টার শেল ও বাসায়নিক পাউডার ছিটিয়ে দালানটিকে মাটির সাথে গুড়িয়ে দেয়। ঐ সময় তাদের ঘর থেকে রাজাকাররা প্রায় একশ ভরি স্বর্নালঙ্কার সহ অনেক মূল্যবান সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। ওই বাড়ির গৌরঙ্গ চন্দ্র পোদ্দারসহ নিপিন্দ্রনাথ পোদ্দার, শিক্ষক সুখদেব সাহা, জয়দেব সাহা, মনি কৃষ্ণ সাহা, লক্ষী চন্দ্র সাহাকে পাক বাহিনী বেধে নিয়ে যায়। যুগল বালা সহ আরও ১০/১২ জন যুবতী মেয়েকে একই বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে নিকারী বাড়ীর কাছে একটি টিনের ছাপরা মসজিদে নিয়ে তাদের উপর অমানবিক অত্যাচর (ধর্ষণ) চালানো হয়। যুগলবালার স্বামী গৌরাঙ্গ চন্দ্র আজও ফিরে আসেনি। অনেকের কাছে শুনেছে, তার স্বামী সহ সকলকে হত্যা করে আড়িয়ালখা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি তা বিশ্বাস না করে মৃত্যুর আগ দিন পর্যন্ত স্বামীর পথ চেয়ে অনবরত অশ্রু বিসর্জন দিয়ে গেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী দীনেশ চন্দ্র সাহা ও মধু চন্দ্র সাহা জানান, ঐ সময় মনোহর বাজার ও রুদ্রকর এলাকায় বরিশাল ও মাদারীপুর জেলা থেকে কয়েকশত হিন্দু নর-নারী নিরাপদ আশ্রয় নিতে এ এলাকায় এসেছিল। ঐ সকল আশ্রয় নেয়া লোকদের অধিকাংশ সেদিন ঘাতকদের গুলিতে শহীদ হন। যারা বেঁচে ছিলেন তাদের অনেককে মাদারীপুর ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। আশ্রয় নিতে আসা চিত্ত রঞ্জন ডাক্তার তার স্ত্রী ও ৩ ছেলে সহ মোট ৯ জনকে একই স্থানে ঘাতকরা গুলি করে হত্যা করে।
সুভাষ দাস ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ২২ মের পরেও পাক সেনারা আরো দু’বার এ এলাকায় হানা দিয়ে অনরূুপভাবে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, একদিকে পাক বাহিনীর হত্যা ,ধর্ষন যেমন চলতে থাকে অন্যদিকে রাজাকার মুসলিম লীগের লোকজন কাশিপুর দাঁদপুর, চরচটাং থেকে দলে দলে এসে লুটতরাজ অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। গৌরঙ্গ দাস (৭৫) ও মিনা রানি পোদ্দার (৭০) জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ মাস ধরে যেখানে সেখানে অগনিত পচা গলা লাশ পড়ে ছিল। সৎকার করার কেউ ছিল না। কুকুর শিয়ালে লাশ খেয়েছে। দূর্গন্ধে অনেক দিন পর্যন্ত কেউ এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী যারা বেঁচে আছেন তাদের থেকে জানা যায়, ২২ মে’র পরে ও পাক সেনারা আরো কয়েক দফায় এ এলাকায় হানা দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। প্রথম দিনই (২২ মে) তারা প্রায় ৩ শত ৭০ জন শিশু ও নর-নারীকে হত্যা করেছিল। মাদারীপুরে ধরে নিয়েছিল আরো দুই শতাধিক নারী- পুরুষকে। ঐ সময় কমপক্ষে ৪ শত পরিবরের ঘরবাড়ি সম্পদ টাকা পয়সা স্বর্নালংকার ও গরু বাছুর লুট করে নিয়ে যায়। অন্তঃত ৩ শ’ ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ৭১ এর নির্মম, নৃশংস, মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডের সাথে যে সকল রাজাকার আল বদর বাহিনী জড়িত ছিল সে সকল রাজাকারের অন্যতম প্রধান সর্দার ছিল কাশিপুরের সোলাইমান মৌলভীসহ অনেকেই। কুখ্যাত রাজাকার সোলায়মান মোল্যা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় মারা যায়। আর পলাতক রাজাকার ইদ্রিস সরদারের ফাসির আদেশ দিয়েছে মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এতে করে এ এলাকার নির্যাতিত বেচে থাকা নারী পুরুষেরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী আবুল কালাম হাওলাদার জানান, আমার বয়স তখন ১৪/১৫ বছর। ৭১ এর ২২ মে আমি দুপুরে দোকানে বসা ছিলাম। আমাকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে পাক সেনারা আমাকে দিয়ে মর্টারসেল বহন করায়। পাক সেনারা মধ্যপাড়ার কয়েক জন পুরুষকে ধরে এনে কলেমা পড়ানোর নাম করে রাস্তায় শুইয়ে রাইফেলের বাট দিয়ে বেধরক পেটাতে থাকে। মতিলাল সাহা নামে একজন নিঃসন্তান বৃদ্ধকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং স্বর্ণঘোষের রাজাকার আজিজ মোল্যা চন্দ্রাই ঠাকুর নামে ৯৮ বছর বয়স্ক এক অচল বৃদ্ধকে কোলে করে এনে মাঠে বসিয়ে পাক সেনাদের দ্বারা গুলি করে হত্যা করে। নুর মোহাম্মদ মোল্যা নামে একজন রাজাকার পাকসেনাদেরকে রুদ্রকর বাবুর বাড়ির দিকে নিয়ে যায়। জমিদার প্রমথ চক্রবর্তির বাড়ির ১ শত ৫০ ফিট উচু মঠের উপর উপুর্যপুরি মর্টার সেল দিয়ে হামলা চালায়। আজো সেটি সদম্ভে দাড়িয়ে আছে রুদ্রকরের বুক চিড়ে।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ মাষ্টার বলেন, বিবেকের তাড়নায় নিজে বাদী হয়ে রাজাকার সোলাইমান মৌলভী ও তার দোষরদের বিরুদ্ধে আদালতে যুদ্ধাপরাধের মামলা দায়ের করেছি। এদের বিচার কাজ শেষ হয়েছে। বিচার কার্যকারিতা দেখে যেতে চাই।
বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আবদুর রহমান খান(দুলু) বলেন, একদিকে পাকবাহিনীর হত্যা, ধর্ষন যেমন চলতে থাকে অন্যদিকে রাজাকার মুসলিম লীগের লোকজন কাশিপুর দাঁদপুর, চরচটাং থেকে দলে দলে এসে লুটতরাজ অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। কুখ্যাত রাজাকার ইদ্রিস আলী সরদার ওরফে গাজী ইদ্রিস এর মৃত্যুদন্ড রায় দেয়ায় আমরা অত্যন্ত খুশি। তাকে তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে ফাসির রায় কার্যকর করার দাবী জানাচ্ছি।
শরীয়তপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুর রব মুন্সি বলেন, ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোষর রাজাকার আলবদর বাহিনীর সেই বিভীষিকাময় অত্যাচারের কথা স্মৃতিপটে ভেসে উঠলে আজো শিউরে উঠি, এ অঞ্চলের শত শত শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে মনোহর বাজারে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মান করেছি। সংরক্ষিত তথ্যের অভাবে সকল শহীদের নামের তালিকা স্মৃতি স্তম্ভে প্রদর্শন সম্ভব হয়নি।

ডয়েচেনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটডিই/এমআরএফ