বৃহস্পতিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

মোসলেমরা এত বোরিং কেনো?

জিয়াউদ্দিন সরদার
প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬ শনিবার, ০১:৫৬  এএম

মোসলেমরা এত বোরিং কেনো?

জিয়াউদ্দিন সরদারের এই প্রবন্ধটি ডয়েচেনিউজের জন্য অনুবাদ করেছেন মিনহাজ আমান


গত ২৫ ধরে আমার স্ত্রী একটি স্বাস্থ্য-সুরক্ষার নিমিত্তে তোইরী একটি স্কুলে অনেকটা বিনাপয়সায় শ্রম দেয়। যেখানে মূলত সুসজ্জিত-সহায়তাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ সবার জন্যে উন্মুক্ত থাকে। প্রত্যেক বছর সেখানে রমজানের আগমন উদযাপন উপলক্ষে বিশেষ একটি এসেম্বলির আয়োজন করে থাকে। তখন অব্যররথভাবে সেখানে একটি প্রশণ উঠে, মোসলমানরা এত বোরিং কেনো?
এই এসেম্বলিতে প্রদর্শনের জন্য থাকে কুরআনের নানা কপি, এক জোড়া জায়নামাজ এবং একটি একঘেয়ে পস্টার। সাথে থাকে কুরআনের একনিষ্ঠ তেলোয়াত। অপরদিকে হিন্দুদের দিওয়ালির দিকে তাকালে দেখবেন, নানা রঙের ঝলকানি, নতুন জামা, নাচ-গান। একইরকম চৈনিকদের নতুন বর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান দিত্যো-তেও। ফলে স্কুলে সবার মাঝে খুব স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের উতসব থেকে ভিন্ন সব উতসবকে খুব আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করে।
আমি এসব শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতাবোধ করি। আমরা মোসলমানরা আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রে খুব বেশি সক্ষম না। আমরা আমাদের ধর্মকে কিছু আচারানুষ্ঠানে আবদ্ধ করে ফেলেছি যেগুলোকে আমরা একরকম রোবটের মত করে আদায় করি। মোসলমানরা যখন কোন কিছু উদযাপন করে, তারা কেবল দু’রাকাত বিশেষ প্রার্থণা করেই ক্ষান্ত দেয়। এভাবে আমরা আমদের মাঝে যারা আনন্দ-মশকরা করতে চায়, তাদের এই চাওয়াকে খারিজ করে দেওয়া হয়। দূর্ভাগ্যবশ্ত, কিছু আলগা ঘাসের মত কিছু লোক যখন আকড়ে ধরার মত একটি “ইসলামী সরকার” পায়, তারা সুর-সঙ্গীতকে হারাম ঘোষনা করে। সিনেমা বন্ধ, নাচ-থিয়েটার চুপ আর শিল্প-কল্পনাকে বাতিল করে দেয়া হয়। তখন বাকি বিশ্ব ভাবতে শুরু করে, মোসলেমদের মানবতার বড্ড অভাব আছে।
কোন বাস্তব সমাজই সংস্কৃতির বহুমূখী প্রস্তাবনা বা কর্মসূচি ছাড়া এক পা এগোতে পারেনা। নামায এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি আমাদের প্রকৃত বিশ্বাসী এবং নীতিবান হতে শেখায়। কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রকাশ আমাদের পুরোপুরি মানবিক হতে শেখায়। আমি বলতেচাই, নামায এবং কিছু নির্দিষ্ট আচারানুষ্ঠান আমাদের পুরোপুরি আলোকিত করতে পারেনা। তাই মনের গভীরতম জায়গায় আমাদের দরকার একধরনের সাংস্কৃতিক পরিচর্যা। আমাদের সকলের নিজের মহিমান্বিত চিন্তা-আবেগ-অনুভুতি প্রকাশের একধরনের স্বাভাবাইক খায়েশ থাকে। এছাড়াও আমাদের বিনোদনের একটু সুযোগ ও থাকা চাই। যাতে আমরা অন্তরের দিক দিয়ে প্রীত বোধ করতে পারি। যাতে আমরা ক্ষনিকের পদচারনায় আকস্মিক নাড়া পাই। যাতে সকলের সাথে আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করতে পারি। কিন্তু এইগুলির সু্যোগ কি আছে আ,=মাদের বিরাজমান উতসব উদযাপনের কোন ধরনে?
এই ধরেন উদাহরনস্বরুপ, একটি এবসার্ড প্রস্তাব হচ্ছে, ইসলামে সুর-সঙ্গীত নিষদ্ধ। এটা যদ্য সত্য হয়, তবে ইশ্বর ব্যবস্থা করেছেন যাতে আমরা সেগুলোকেই বাতিল বা অস্বীকার করি। কেননা সেগুলোকে তিনি সজ্ঞানে আমাদের কাছে প্রপ্তহমে পাঠাতে রাজি হয়েছেনঃ গানের সৌন্দর্য। অন্যভাবে বলা যায়, প্রস্তাবমতে তারা এমন একটি ব্যাপারকে বাদ দিতে চান যেতি কিনা আমাদের পাচটি ইন্দ্রিয়ের একটি। মানে পুরো মানুষ হওয়ার পথে এক-পঞ্চমাংশ বাদ পড়ে গেলো। এই প্রস্তাব সত্য হলে, ইসলামের ইতিহাসের নদী-উপত্যকাগুলো যেগুলো সুরের সাথে সম্পর্কিত সেগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়। আজকের যুগের অন্যতম জনরিয় সুরেল যন্ত্র গিটার, যা কিনা মোসলেম শাসিত স্পেনে আবিস্কৃত হয়েছে। সুফিবাফে ব্যবহৃত সুরের কথা তো আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখেনা। যেখানে সুরকে অবলম্বন করে অলৌকিকতার পথে এগিয়ে যায়, আল্লাহর আরো কাছে চলে আসে।
আরেকটি এবসার্ড দাবী হচ্ছে, ইসলামে ছবি না-জায়েজ। তাই সিনেমা-টেলিভিশন-চিত্রকর্ম-ভাস্কর্য ইত্যাদি নানা শিল্প নিষিদ্ধ করার পক্ষে বলেন। ইসলামে প্রতিমা-উপাসনা পরিহার করার কথা বলে হয়েছে। কিন্তু যেকোন ছবি, ভাস্কর্য পেলেই মোসলেমরা নাকি পূজা করবে, এতটাও নির্বোধ মোসলেমরা নন। এরপরেও সমাজের অনেকে দাবি করেন, ছবির অস্তিত্ব ছাড়াও মোসলেমদের চলে যায়। অথচ এই সমাজের ছবি বার্তা আদান-প্রদান, সমাজ-মানুষকে ক্যানভাসে তুলে আনতে এবং শক্তি-সুযোগকে সামনে আনতে বিরাট ভুমিকা পালন করতে পারে। সেখানে এই নিষিদ্ধের প্রস্তাব আত্মহত্যার শামিল। আমাদের বুঝতে হবে, সংস্কৃতিই শোক্তি। বস্তুত, সংস্কৃতি এখন দুনিয়াতে বেশি শক্তিশালি। বলিউডের প্রভাব কেবল
ভারত নয়, সারা দুনিয়াতে তাকালেই দেখা যায়। খেয়াল করলে দেখা যায়, হলিউড কিভাবে এমেরিকান সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। কিভাবে হংকং-চাইনিজ আর্ট সিনেমাগুলি “হলিউডি” মাত্রা পাচ্ছে। ইউরোপীয় ফিকশোনের প্রভাব সারা বিশ্বেই দেখা দেখা যায়। ভাবুন, কিভাবে শিল্প সমাজে মানুষের ক্ষনিকের বেচে থাকাকে কিভাবে আলোকিত করে, কিভাবে নানা মতকে সামনে আনে। দেখুন সুর-নাচ মানুষকে একত্রিত করতে পারে। সংস্কৃতি প্রতিবাদের ও একোটি ভাষা হতে পারে। আমরা ম্যাকডোনাল্ড-কোকাকোলা সংস্কৃতিকে টেক্কা দিতে পারি আমাদের সংস্কৃতি দিয়ে। আমরা যদি তা না পারি, আমরা পাল্টা যদি শিল্প-ভাস্কর্যকে নিষিদ্ধের লিস্টে আবদ্ধ করি, সিনেমা-ফিকশনকে বাতিল ঘোষনা করি, তাহলে আমরা প্রতিবাদের একোটি মোক্ষম অস্ত্র হারিয়ে ফেলব। আমাদের এখন ভিক্টিম হয়ে কালের গরতে গড়াগড়ি করতে হবে।
অবশেষে, সংস্কৃতির প্রকাশ আল্লাহকে ধন্যবাদ জানানোর ঈকটি মাধ্যম ও হতে পারে। আমি যখন কাওয়ালি বা সিতারের সুর শুনি, ইরানী নতুন কোন সিনেমা দেখি বা কোন অসাধারন বই-চিত্রকর্ম দেখি, আমি অজান্তেই আওবাক হয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেলি। এভাবেই প্রতিনিয়ত আল্লাহ আমাদের অজস্র করুনা দিয়ে আমাদের আলোকিত রেখেছেন। এভাবেই তার মহানুভবতার নানা চিহ্ন-অনুভুতি এভাবে প্রকাশ পায়।
কিন্তু, অযথা সাংস্কৃতিক প্রকাশের প্রতি কোন বাধা সৃষ্টি হলে সেটা অকৃতজ্ঞের কাজ হবে। এটি আল্লাহর দয়া এবং সাংস্কৃতিক উদারতারকে পা তলায় ফেলে নষ্ট করার মত কাজ হবে। এই কারননেই বেশিরভাগ ক্ষিটখিটে মুসলিমদের আপনি দেখেবন, তারা একেবারে মনের দিক দিয়ে দৈন্য। তারা সংস্কৃতির প্রশংসা করা থেকে পিছিয়ে থাকে। তারা সংস্কৃতির নানা প্রকাশকে বিরক্তিকর ভেবে-অবজ্ঞা করে একধরনের মানসিক কোষ্ঠকাষ্ঠিন্নে ভোগে।
পরিশেষে বলা যায়, আমরা বরং কারন আমরা আধা-মানব হিসেবে বেচে থাকতেই পছন্দ করি।

জিয়াউদ্দিন সরদার: লন্ডনভিত্তিক স্কলার ও লেখক।