শনিবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

বিজয়ের দিনে আদিবাসী স্বপ্ন ও অধিকার

সঞ্জীব দ্রং
প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬ শনিবার, ০১:৫৫  এএম

বিজয়ের দিনে আদিবাসী স্বপ্ন ও অধিকার

কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘কথা ছিল’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘কথা ছিল, আমার আনন্দ-গানে ভরিয়ে তুলবো অলিগলি, জনপথ, অবাধ প্রান্তর/আমার ভরাট গলা ছোঁবে দিগন্তকে/ কথা ছিল, পায়রা উড়িয়ে দেবো ভোর বেলা মেঘের কিনারে/কথা ছিল উৎসবের কবিতা নিরুদ্বেগ লিখে মুছে ফেলবো সকল দুঃখ শোক/কথা ছিল প্রত্যেককে দেখাবো অনিন্দ্য সূর্যোদয় মুক্ত মনে/অথচ এখন, এ মুহুর্তে সূর্যাস্তের ছোপলাগা কবরের দিকে অসহায় চেয়ে থাকি/বন্দীদশা এল বুঝি পুনরায়।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে গারো, হাজং, সাঁওতালসহ অনেক আদিবাসী সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন। অনেকে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন দেশের জন্য। তাদের নাম নানা জায়গায় শহীদ স্মৃতি বেদিতে। বুদু উঁরাও তার দলবলসহ তীরধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করেছিলেন। দুঃখের বিষয়, স্বাধীরতার ৪৬ বছর পরও আদিবাসী মানুষের জীবনে অর্থপূর্ণ মুক্তি আসেনি। শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান হয়নি। উল্টো আদিবাসী মানুষকে এখনও ভয়াবহ নির্যাতন ও মানবাধিকঅর লংঘনের শিকার হতে হচ্ছে। সর্বশেষ গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। এই বর্বরোচিত ঘটনার বিচার এখনও হয়নি।


এখন প্রশ্ন করি, স্বাধীনতার ৪৬ বছরে আমরা আজ কোথায়? মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার, মানবাধিকারের আজ কী অবস্থা? সংখ্যালঘুদের জীবন আজ কেমন? নাগরিক হিসেবে তাদের মানবাধিকার, মর্যাদা ও সম্মান কোন্ স্তরে? এই প্রশ্নের উত্তর আছে কবি শামসুর রাহমানের কবিতায়। যে কথা ছিল, তা হয়নি। তবে কিছু ইতিবাচক কাজ হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৬ বছরে যা হয়েছে তা হলো, আদিবাসী ইস্যু নিয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা হচ্ছে। দেশে নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, মিডিয়া আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চকণ্ঠ আদিবাসী বিষয়ে।

আশার কথা যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অনেক উচ্চ কন্ঠ আদিবাসী অধিকার নিয়ে। সংসদীয় ককাস কাজ করছেন যেখানে ৮০ ভাগ সংসদ সদস্য বাঙালি। দেশে এনজিওদের মধ্যে বেশ উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষানীতিতে আদিবাসী বিষয় যুক্ত হয়েছে। নারী উন্নয়ন নীতি, ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ইত্যাদিতে আদিবাসী ইস্যু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ধরনের কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলা যায়। সংবিধানে আদিবাসী বিষয়টি এসেছে অন্যরকমভাবে, উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হিসেবে। এখানে আবার অন্যান্য নানা সমস্যা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। সে বিষয়ে এখানে আজ বলবো না। নাটকে, বিজ্ঞাপনে, গানের সভায়, রূপালী পর্দায় আদিবাসী উপস্থিতি এখন দেখা যায়। লাখো কন্ঠে জাতীয় সংগীতের যে আয়োজন ছিল, তার প্রচারে যে মূল ছবি, সেখানেও সবার সাথে সামনের সারিতে একটি আদিবাসী মেয়ের ছবি ছিল। সব মিলিয়ে বলা যায়, আদিবাসী ইস্যু এখন বেশ আলোচিত বিষয়। আমরা চাই আদিবাসী-বাঙালি সম্মিলিতভাবে একটি গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখবে।

আদিবাসী মানুষের অধিকার উপলব্ধি করা, হৃদয়ে ধারণ করা, আদিবাসী স্বপ্নকে বুকের গভীর থেকে অনুভব করা সহজ কাজ নয়। এখানে রাষ্ট্রকে তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে যেন আদিবাসী মানুষের প্রতি সমর্থন, সহানুভূতি, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ জন্মায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। মহাশ্বেতা দেবী আবার লিখেছেন, ‘আদিবাসীদের সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতিচেতনা, সভ্যতা, সব মিলিয়ে যেন নানা সম্পদে শোভিত এক মহাদেশ। আমরা, মূলস্রোতের মানুষেরা, সে মহাদেশকে জানার চেষ্টা না করেই ধ্বংস করে ফেলেছি, তা অস্বীকার করার পথ নেই।...মূলস্রোতের ধাক্কায় এদের বারবার দেশান্তরী হতে হয়েছে। ফলে অনেক কিছু গেছে হারিয়ে। মূলস্রোত এই বিষয়ে যে অপরাধে অপরাধী তার ক্ষমা নেই।’

জাতিসংঘ পৃথিবীর ৭০টি দেশের প্রায় ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগণের উন্নয়ন ও অধিকার রক্ষায় কাজ করছে। জাতিসংঘে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম গঠিত হয়েছে ২০০০ সালে। আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র গৃহিত হয়েছে সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ র‌্যাটিফাই করেন। এই কনভেনশনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু এই কনভেনশনের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে আইন বা নীতিমালা হয়নি এখনো। এ কনভেনশনের মূল কথা, আদিবাসীদের কাগজ বা দলিল থাকুক বা না থাকুক, যে জমি ঐতিহ্যগতভাবে ওরা ব্যবহার করে, সে জমি তাদের। আইএলও কনভেনশনের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “আদিবাসীদের ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির উপর যৌথ কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকার করতে হবে।” আন্তর্জাতিক সনদের বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং এর আলোকে আইন না থাকায় আদিবাসীরা তাদের ভূমি রক্ষা করতে পারছে না। এখন সময় এসেছে আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ অনুস্বাক্ষর করার। নেপাল আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ ইতিমধ্যে র‌্যাটিফাই করেছে। আদিবাসী অধিকারের প্রশ্নে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এই ১৬৯ নং কনভেনশন র‌্যাটিফাই হলে আদিবাসীদের সঙ্গে সরকার, আইএলও, সবার মধ্যে সমন্বিত কাজের ক্ষেত্র বাড়বে, সহভাগিতা বাড়বে, আদিবাসীদের উপকার হবে, সরকারও সম্মানিত হবে। উভয়ের মর্যাদা বাড়বে। আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়বে, আলোচনা ও সংলাপের দুয়ার আরো উন্মুক্ত হবে।


একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল আমাদের। আদিবাসীদের আনন্দ-বেদনা-স্বপ্ন-উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়া সব
জড়িয়ে আছে এই স্বপ্নের বাস্তবায়নের মধ্যে। আদিবাসী মনকে, ওদের মনস্তত্ত্বকে, জীবন ভাবনার বিশ্বজনীনতাকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে, গায়ের জোরে, শক্তির দাপটে নয়। ওদের জীবনে বহিরাগতরা প্রবল রাষ্ট্রীয় শক্তি নিয়ে ঢুকে গেছে আর সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের মতো চলে গেছে সব জমি, বন, পাহাড়, প্রাকৃতিক সম্পদ। ওরা এখন অধিকারহীন অসহায় মানুষ। সংবেদনশীল, বিনম্র, প্রচন্ড ভালোবাসা ছাড়া আদিবাসীদের উন্নয়ন এখন আর সম্ভব নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি - সবখানে এ ভালোবাসার প্রতিফলন দরকার। দরকার সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ এ চরম অসহায়ত্ব, দারিদ্র ও প্রান্তিক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য। আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ওদের মনে যেন এই ধারণা না জন্মায়, ওরা অন্যের দ্বারা শাসিত হচ্ছে, শাসকগোষ্ঠী ওদের শাসন করছে। এই কাজটি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং মূল দায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের। সব কিছুর জন্য দরকার আদিবাসীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলাপ আলোচনা ও সংলাপ। আদিবাসীদের আস্থায় এনে এ কাজটি করতে হবে। আদিবাসীদেরকেও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভেরিয়ার এলুইন তার আদিবাসী জগত বইয়ে লিখেছেন, ‘পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জাতীয় স্বার্থেও যেমন প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন পাহাড় ও অরণ্যের মানুষদের স্বার্থে। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে পারি। আদিবাসীদের আমরা অনেক কিছু দিতে পারি, আবার ওদেরও অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেবার মতো।’


আদিবাসী ইস্যুতে পৃথিবীর অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নরওয়েসহ স্ক্যানডিনেভিয়ান কয়েকটি দেশে আদিবাসী সামি পার্লামেন্ট আছে। আমরা তাদের উদাহরণ দিই। নেপালের কনস্টিটিউশন এসেম্বলিতে জনজাতিদের বড় ভূমিকা এবং ওদের সংসদের স্পীকার ছিলেন লিমবু আদিবাসী। এক সময় ভারতের স্পীকার ছিলেন মেঘালয়ের একজন গারো। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, জাপান, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম এরকম আরো অনেক দেশের উদাহরণ আমরা দিতে পারবো যারা চেষ্টা করছেন আদিবাসীদের অধিকার প্রদানের। অস্ট্রেলিয়া সরকার অতীতের ভুল আচরণের জন্য পার্লামেন্টে আদিবাসীদের কাছে ঐতিহাসিক ক্ষমা চেয়ে বলেছে, ‘এই ক্ষমা প্রার্থনা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আমরা একে অপরের যাতনা বুঝতে পারবো এবং সামনে অগ্রসর হতে পারবো।’ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। আইএলও কনভেনশন র‌্যাটিফাইয়ের বেলায়ও তারা শীর্ষে।

তাই আশা করি, একদিন আমাদের রাষ্ট্র অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও মানবিক হবে। দেশে জাতীয় আদিবাসী কমিশন গঠিত হবে। একটি আদিবাসী নীতি থাকবে। সে নীতির মূল কথা হবে, আদিবাসী স্পর্শ বা ইনডিজিনাস টাচ, অসীম ন¤্রতা, শুদ্ধতা, হৃদয়ের বিশালতা ও সংবেদনশীলতা নিয়ে লেখা হবে সে আদিবাসী নীতিমালার বাক্যগুলো। তখন আইএলও কনভেনশন বাস্তবায়িত হবে আদিবাসী কল্যাণে। আমাদের সবাইকে মিলেমিশে রাষ্ট্রকে তার সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আদিবাসী-বাঙালি সবার মধ্যে যোগাযোগের সংবাহন বিন্দু গড়ে তুলতে হবে। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই, কথাটি সত্যি হবে। পাহাড়ি শিশুর হাত ধরে পরম আনন্দে পথ চলবে বাঙালি শিশু। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমার সঙ্গে শংখ-মাইনী-মেননেং-সীমসাং নদীকে মেলাবার কাজ শুরু হবে, জীবনে জীবন যোগ হবে।