বুধবার ২৩ আগস্ট, ২০১৭
deutschenews24.de
Ajker Deal

দেশে বিদেশী, বিদেশে প্রবাসী

খান লিটন
প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার, ০৬:১৪  এএম

দেশে বিদেশী, বিদেশে প্রবাসী

জার্মানিতে আসা বাংলাদেশীদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে লিখার ইচ্ছা ছিল। লিখা শুরু করে মনে হলো তার আগে জার্মানির একটু বিবরন দিয়ে নিই। পশ্চিম ইউরোপের ইউরোপের একটি শিল্পোন্নত দেশ জার্মানি । এদের ভাষা জার্মান বা ডয়েচ। বর্নমালাগুলো ইংরেজীর মতো হলেও উচ্চারন আলাদা । রয়েছে আরবি হরফের মতো জের , জবর , পেশ ( উমলাউট ) । ১৬ টি প্রদেশ নিয়ে জার্মান রিপাবলিক গঠিত। সর্ব মোট লোকসংখ্যা ৮৪ মিলিয়নের উপরে । ৯৯ শতাংশ শিক্ষিত । মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ বিদেশী অভিবাসী। এর মধ্যে ১৪ শতাংশই তুরস্কের মুসলমান । বর্তমান সরকার প্রধান ( চ্যান্সেলর ) অ্যাঙ্গেলা মেরকেল । জার্মানির ইতিহাসে তিনিই প্রথম মহিলা সরকার প্রধান বা চ্যান্সেলর । রাস্ট্রপতি Joachim Gauck.যথেস্ট কৃষি উৎপাদন রয়েছে দেশটির ।

দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দুরে জার্মানিতে যে যেভাবেই আসেন না কেন, বেশিরভাগই কিন্তু লড়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো প্রত্যাশা মাফিক জীবনের স্থিতিটা পেয়ে যান। আর কাউকে কাউকে জীবনভরই লড়তে হচ্ছে। সেই সত্তর দশকে পড়াশোনার জন্য হাতেগোনা কয়েকজন বাংলাদেশী জার্মানীতে আসলেও আশির দশকে জীবিকার অন্বেষনে বাংলাদেশীরা বেশি করে আসতে শুরু করে । রাজনৈতিক শরনার্থী হিসেবে বেশীরভাগের জীবন শুরু করে । ২০১০ এর দিকে আবারো পড়াশোনার জন্য বেশ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনার জন্য আসার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সব মিলিয়ে প্রায় আট হাজার বাংলাদেশী জার্মানিতে বসবাস করে ।

প্রথমেই যে কথা বলতে চাই সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের দূতাবাসের অভিজ্ঞতা। বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাস জার্মানি ছাড়াও স্লোভেনিয়া, চেক রিপাবলিক ও হাংগেরীর দূতাবাসের কাজ করে। দূতাবাস বাংলাদেশীদের সব ধরনের সহযোগীতা দিতে চেষ্টা করেন । যদিও নাগরিক সেবার ব্যাপারে বেশ অভিযোগ রয়েছে। যেমন প্রথমত টেলিফোনে সহজে পাওয়া যায় না, রাজনৈতিক আশ্রয়ধারীদের অসহযোগীতা করা, যারা ব্যাবসা করতে আগ্রহী তাদের সঠিক গাইড লাইন না দেয়া। দূতাবাস নিয়ে অভিযোগ অল্পবিস্তর সবসময়ই আছে। আমার মনে হয় এর আশ সমাধান করা দরকার।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে জার্মানিতে বাংলাদেশীদের দ্বারা পরিচালিত কোন নিয়মিত স্কুল নাই। তবে বন , ফ্রাংকফোর্ট , কোলন , হামবুর্গ , বার্লিন এ বাংলা শেখার জন্য সপ্তাহের ছুটির দিনে কয়েকটি স্কুল চলে। সেখানে হাতেগোনা সংখ্যক শিশুরা যাওয়ার সুযোগ পায়। এখানে জন্ম নেয়া শিশুরা সবাই বাংলা বলতে পারলেও বেশীর ভাগরাই লিখতে পড়তে পারে না। আমরা আয় করি রাশি রাশি ইউরো, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রজন্ম নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা থেকে। তবে অন্যদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তানরা কিন্তু ঠিকই তাদের মাতৃভাষায় দক্ষ। আমার শঙ্কা হয়ত আমার তৃতীয় প্রজন্ম বলবে শুনেছি -- নানা / দাদা ছিলেন বাংলাদেশী বা এশিয়ান।

এখানে বাংলাদেশিদের মধ্যে গঠন কোনও কাজ খুবই কম চোখে পড়ে। দু:খজনক হচ্ছে ব্যাংঙে ছাতার মতো রয়েছে বেশ কিছু সমিতি । বেশীরভাগই নিজেকে জাহির করতে ব্যাস্ত । তবুও কিছু সংস্কৃতি কর্মী নিরলসভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য কাজ করে । আছে বাংলাদেশ এর রাজনৈতিক দলের বেশীর ভাগেরই শাখা, যদিও নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী কোন বৈদেশিক শাখা থাকার নিয়ম নাই। দলীয় কাদাঁ ছোড়াছুড়ি এখানে নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। এবং সেটা আবার একই দলের মধে। মানে এখানে একই দলের রয়েছে বহু গ্রুপ। আমার অভিজ্ঞতা বলে, সভাপতি, সাধারন সম্পাদকের পদ বাগিয়ে দেশে গিয়ে তদবির ব্যাবসাই বেশীরভাগদের উদ্দেশ্য ।

জার্মানিতে বাংলাদেশীরা চাকরির পাশাপাশি গার্মেন্টস, রেঁস্তোরা সহ অন্যান্য ব্যাবসার সাথে জড়িত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন অনেকেই। মোটের উপর বলবো যে এত বিভেদ, মতভেদের পরও যে যেখানে আছে সেখানে সুনামের সঙ্গেই কাজ করছেন। অজানা -অচেনা পরিবেশে এই হিত শীতল ঠান্ডার দেশে রক্ত জল করা পরিশ্রমে নির্মান করে নিজেকে । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্ম মূখ্য নয়, অর্জনই মূখ্য। গন্ধ বিহীন ফুল, হৃদয়হীন ঠান্ডা দেশের অর্জন দিয়ে নিজ ও দেশের জন্য আয় করে বৈদেশিক মুদ্রা, পাঠায় দেশে। এটা প্রত্যেক প্রবাসীর মহৎ কর্ম । বাংলাদেশে আমাদের আত্বীয় স্বজন ও সরকারের উচিত আমাদের এই ত্যাগের সন্মান করা ও প্রবাসীর বিভিন্ন সমস্যার সুষ্ঠ সমাধান করা । আমরাও তোমাদের কেউ না কেউ - দেশে বিদেশী , বিদেশে প্রবাসী ।